Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

কারণ রেডিও কলার :
নজরদারির অভাবে মারা গেল ‘সুন্দরী’ বাঘিনী

স্টাফ রিপোর্টার, নেচার ইন্ডিয়ানঃ বিজ্ঞান যে কেবলমাত্র আশীর্বাদই নয় অভিশাপও বটে তা আরো একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এক বাঘিনীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে বাঘ হল বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীদের মধ্যে যা সংরক্ষণের জন্য একদিকে যেমন বিশ্বজনীন তৎপরতা বজায় রয়েছে অন্যদিকে ঠিক তেমনই রয়েছে অজ্ঞতা এবং সরকারি ঔদাসিন্য। ফলতঃ সংরক্ষণের পরিবর্তে আমার পৃথিবীর এই চরম আশ্চর্যতম প্রাণীটিকে ক্রমে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছি কিনা সেই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল।

ঘটনায় প্রকাশ ১০ই মার্চ ২০১৫ সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পে বাঘনা রেঞ্জের অধীনে পীড়খালি বনক্ষেত্রে একটি স্বল্প বয়সি বাঘিনীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হল। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা গেছে বাঘিনীটির মৃত্যু হয়েছে দেড়-দু’মাস আগে।ভেটেনারী সার্জেনের বক্তব্য অনুযায়ী বাঘিনীটিকে পরান রেডিও-কলার থেকে গলায় সৃষ্ট সংক্রমক জনিত ক্ষতই হল মৃত্যুর কারণ। বাঘের গলায় রেডিও-কলার পড়ানো হয় এদের গতিবিধি, আচার-আচরণের উপর নজর রাখার জন্য যা বিজ্ঞানেরই অবদান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ এই প্রযুক্তিবিদ্যাই জীবের কাছে চরম অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

২০১৩ সালের শুরুর দিকে এই বাঘিনীটিই বনদপ্তরের জালে ধরা পড়েছিল আহত অবস্থায়। পিছনের পায়ে আঘাত থাকার দরুণ সে শিকার করতে পারছিল না। আনা হয়েছিল সজনেখালিতে। সে সযত্নে বাঘিনীটির চিকিৎসা করা হয়। প্রায় দেড় বছর পরে সুস্থ অবস্থায় বাদাবনের জঙ্গলে তাকে যখন ছেরে দেওয়া হয় তখন তার গলায় পড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল একটি রেডিও-কলার, যাতে রেডিও টেলেমিট্রি বা জিওগ্রাফিক পজিশনিং সিস্টেমের মাধ্যমে ওর গতিবিধির সন্ধান করা যায়।

জঙ্গলে ছাড়ার কয়েক মাসের মধ্যে বাঘিনীটির গলায় পরানো রেডিও-কলারের থেকে আসা তথ্যানুযায়ী জানা যায় সে অরণ্যে নির্বিঘ্নেই বিচরণ করছে এবং তার বিচরণক্ষেত্র মোটেই সীমিত জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়।তারপর হঠাৎই দেখা যায় ক্রমশ সেই বিচরণক্ষেত্রের পরিধি সীমিত হতে শুরু করেছে। এই অবস্থা জানার পরও প্রাণীবিদরা নড়েচড়ে বসেননি এবং এই সমস্যার উৎস কোথায় তা অনুসন্ধান করার চেষ্টাও করেননি। রেডিও কলার থেকে পাওয়া সিগনাল অনুযায়ী বাঘিনীটির নড়াচড়া একদম বন্ধ হয়েছিল গত ফেব্রুয়ারী মাস নাগাদ। তখনই যেন বনদপ্তর বিভাগের টনক নড়ে ওঠে। অনুসন্ধানকারী দল পাঠায় সুন্দরবনে এবং অবশেষে ১০ই মার্চ বাঘিনীটির দেহাবশেষের সন্ধান পাওয়া যায়।

একটু অতীতের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে ২০১৪ সালে যখন বাঘিনীটির গলায় রেডিও কলার পরানো হয়েছিল তখন বাঘিনীটি আয়তনে অপেক্ষাকৃত ছোট ছিল এবং রেডিও কলারটি তার গলার আকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী সময়ের সাথে সাথে বাঘিনীটির দেহ আকারে আয়তনে বৃদ্ধি পায়। আর তখনই যাবতীয় সমস্যার শুরু হয় রেডিও কলার থেকে। বাঘিনীটির সমগ্র দেহের সাথে সাথে গলার আকৃতিও আয়তনে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পুরনো রেডিও কলারের পরিধি গলার তুলনায় ক্রমশ ছোট হতে থাকে। ফলত সেটা বাঘিনীর গলায় ধীরে ধীরে ফাঁসের মতো এঁটে বসে, যা প্রাণীটির কাছে শুধু স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রাশ্বাস নেওয়ারই প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় তাই নয় গলায় গভীর ক্ষতেরও সৃষ্টি করে।

গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে আমরা বন্যপ্রাণীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানার উৎসাহে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে নআক গলিয়ে ফেলেছি। এই অতিরিক্ত জানার উৎসাহই হয়ত তাদের প্রকৃতিগত স্বাভাবিক জীবনধারণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম একটি হল ফ্যালিদ বংশীয়(বাঘ, সিংহ, লেপার্ড ইত্যাদি) প্রাণীদের গলায় রেডিও কলার পরিয়ে তাঁদের গতিবিধির উপর নজর রাখা। এসব করে গিয়ে এদের নির্দিষ্ট প্রজনন পদ্ধতি গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে। ‘নেচার ইন্ডিয়ান’ পত্রিকার সম্পাদক শ্রী শমীক গুপ্ত এইসব প্রাণীদের প্রজনন পদ্ধতির উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান এবং ‘ফাইলো জেনেটিক্স’ এর প্রমাণিত সত্যটি সম্পর্কে বহুদিন আগেই ভারত সরকারের ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটিকে জানিয়েছেন, কিন্তু এন.টি.সি.এ. কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেননি।

বছর চারেক আগে ‘নেচার ইন্ডিয়ান’ পত্রিকায় ফ্যালিদ বংশীয় বাঘ, সিংহ, লেপার্ড ইত্যাদি প্রাণীর প্রজনন পদ্ধতি বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনায় জানা গেছে, এই সব প্রাণীরা তাঁদের আদি জিনগত স্বভাবের জন্য- ফাইলো জেনেটিক্স (গুপ্ত, ২০১১) মিলনরত অবস্থায় স্ত্রী প্রাণীর ঘাড়ের অংশ কামড়ে ধরে যাতে স্ত্রী প্রাণীটি মিলনের সময় নড়াচড়া করতে না পারে। অন্যথায় অসম্পূর্ণ মিলনের কারণে শুধু যে তাঁদের বনশবিস্তারের হার কমে যেত তাই নয় অসম্পূর্ণ মিলনের কারণে পুরুষ প্রাণীটি ক্ষিপ্ত হয়ে স্ত্রী প্রাণীটির ওপর আক্রমণও করতে পারে। এই ঘটনা যে বনের মধ্যে ঘটছেনা এবং তাতে করে যে কোনো বাঘিনীর মৃত্যু হচ্ছেনা কিংবা চোটগ্রস্ত হয়ে পড়ছেনা তা আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। বিজ্ঞানীরা আমাদের সামনে যে যুক্তিই উপস্থাপন করুন না কেন আমরা কিন্তু এই ফ্যালিদ বংশীয় প্রাণীদের রেডিও কলার পরানোর ব্যাপারে ঘোর বিরোধি। ক্যানিদ, ব্রোভিদ, সারভিদ এমনকি হাতিদের ক্ষেত্রে এই রেডিও কলার হয়ত তেমন ক্ষতি করবে না। কিন্তু ফ্যালিদ বংশীয় প্রাণীদের জন্য তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। বিশেষ করে স্ত্রী প্রাণীদের ক্ষেত্রে। এতে করে বাঘ সংরক্ষণ করতে গিয়ে উল্টে তাদের আরো বিপন্ন করে তুলছি আমরা- স্বার্থান্বেষী মানুষ।