Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

ঢিলেঢালা সংরক্ষণ :
কমছে কৃষ্ণগোধিকা

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান কলকাতাঃ একটা অনুমানভিত্তিক পরিসংখ্যান দেখে চমকে উঠলাম। ১৯৩০-৮০, মাত্র ৫০ বছরে কমপক্ষে ২ কোটি কৃষ্ণগোধিকার চামড়া বিদেশের বাজারে রপ্তানি হয়েছে। হ্যাঁ, কেবলমাত্র কলকাতা শহর হয়ে। অতএব স্বর্ণগোধিকাদের পাশাপাশি কৃষ্ণগোধিকার বর্তমান অবস্থাও সহজে অনুমান করা যায়। কারণ বিদেশের বাজারে এই কৃষ্ণগোঘিকার চামড়ার চাহিদা সেদিনও ছিল, আজও আছে, বরং বেড়েছে। অতীতে এইসব বন্যপ্রাণী সামগ্রী আইনি পথেই বিদেশে রপ্তানি হত। কিন্তু বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন-১৯৭২ আসার পর এখন তা বেআইনি পথে পাচার হয়। এইটুকুই যা তফাৎ। সরকারি ‘রেড- লিস্ট’এর ১ নম্বর তালিকায় ইতিমধ্যেই এই গোসাপরা নাম লিখিয়ে ফেলেছে। একদিকে ক্রমাগত বাসভূমি ধ্বংস, অন্যদিকে চোরাশিকার। এই দুই প্রতিকূলতার ফলে প্রকৃতি থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে কৃষ্ণগোধিকা। রাজ্যের প্রধান মুখ্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষক আগেই সোজাসাপটা বলে রেখেছেন, “এইসব ছোটখাটো প্রাণীদের নিয়ে আমাদের ভাববার অবকাশ নেই। বাঘ, হাতি, গন্ডার, বাইসন প্রভৃতি বড় প্রাণীদের সংরক্ষণ দিতেই আমরা নাজেহাল!”

আরে বাবা ! লোকটা বলে কী? দিনআনা পরিবারের আয় বলতে সামান্য আট বিঘা জমির ধান। ফি-বছর যার অর্দ্ধেকের ওপর খেয়ে যায় দলমার দামালরা। “খাচ্ছে খাক, ওদের তো পেট আছে?” আরে বাবা! ‘এছেলে তো হাটকে’। “সরকারি ক্ষতিপূরণ তো নিশ্চয়ই পাও?” – জানতে চাইলে ও বলল “না, হয়তো পেতাম কোনদিন দরখাস্ত করিনি।” তাহলে চার বিঘে জমির ধানে সারা বছর চলে কি করে? “স্যার ভগবানের আর্শীবাদে আমাদের চলে যায়। বিয়ে থা করিনি। কবে হাতি মেরে দেয় তার ঠিক নেই কো। কি হবে টাকা নিয়ে!”

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, পাখির ডিম, ব্যাঙ, গিরগিটি এবং অসংখ্য ছোট জলজ প্রাণীদের খেয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কাজে কৃষ্ণগোধিকা বা গোসাপদের বিশাল অবদান আছে। এরা মুলত স্যাঁতসেঁতে জলাভুমি, গুল্মবন এবং খাঁড়ির জঙ্গলে বাস করে। গোটা সুন্দরবন অঞ্চল হল এদের বাসভূমি। এছাড়া ওড়িশা এবং আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেও এই গোসাপদের বিস্তার আছে। ভারতের বাইরে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, উত্তর মায়ানমার এমনকি অস্ট্রেলিয়ার উত্তরেও কৃষ্ণদের দেখা মেলে। পৃথিবীতে যত প্রজাতির গোসাপ দেখা যায়, আকারের দিক থেকে কৃষ্ণগোধিকা হল দ্বিতীয় বৃহত্তম। ইন্দোনেশিয়ার ‘কমোডো ড্রাগন’ দের পরেই এদের স্থান। বেশ কয়েক বছর আগে দীঘা উপকূলে একটি বিশাল গোসাপ ধরেছিলাম। এর আগে অত বড় গোসাপ দেখিনি। ওটার দৈর্ঘ্য ছিল১০ ফুট ৩ ইঞ্চি। ছেড়ে দিতেই ছুটে গিয়ে জলে নেমে গেল। এরা দুর্দান্ত সাঁতারু। বেশিরভাগ সময়ই জলে কাটায়। মাঝেমধ্যে খাবারের খোঁজে ডাঙায় আসে। তবে বেশিক্ষণ থাকে না। শিকার ধরার পরেই দ্রুত জলে ফিরে যায়। একবার সমুদ্রেরে অনেক গভীরে একজোড়া কৃষ্ণগোধিকাকে সাঁতার কাটতে দেখেছিলাম। সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের ভেতর এখনও বেশ ভাল সংখ্যায় কৃষ্ণগোধিকার দেখা মেলে। সেখানে বাঘেদের সঙ্গে এদের একটা খাদ্য-খাদক সম্পর্ক রয়েছে। জুন-জুলাই মাসের জলের ধারে উঁচু মাটির ঢিপিতে গর্ত করে এরা ডিম দেয়। তারপর সেই ডিম মাটি চাপা দিয়ে চলে যায়। মানুষের প্রয়োজনে, বিশেষত বাঁধ নির্মাণের কাজে সেই মাটিতে কোদাল চালিয়ে এদের অসংখ্য ডিম আমরা নষ্ট করে ফেলি। যা এদের সংখ্যা কমে আসার অন্যতম কারণ। তার ওপর শিকারের চাপ তো রয়েইছে। অতএব, আর কতদিন?

স্বর্ণগোধিকা কমছে

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান, কলকাতাঃ সোনার মত রঙ। ভারি সুন্দর চামড়া। ফলে দেশ বিদেশের বাজারে এই স্বর্ণগোধিকা বা হলুদ গো-সাপদের চামড়ার চাহিদা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। মহিলাদের সৌখিন ব্যাগ, ছোটদের জ্যাকেট কিংবা কোমরের বেল্ট তৈরিতে স্বর্ণগোধিকার চামড়া বড়ই উপযোগি। ফলে ‘সাইটাস’-এর ১ নম্বর তালিকায় নাম উঠেছে এদের। মহাবিপন্ন, বিলুপ্তপ্রায় স্বর্নগোধিকা।

ব্যাপকহারে স্বর্নগোধিকার চামড়া আন্তর্জাতিক চোরাবাজারে বিক্রি হচ্ছে। বাড়ছে চোরাশিকার। পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এই নিরীহ প্রাণীটিকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর আসছে নেচার ইন্ডিয়ানের দপ্তরে। শহর কলকাতার আশপাশের অঞ্চল তার ব্যতিক্রম নয়। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের মাঠপুকুর থেকে শুরু করে চিংড়িঘাটা, মেট্রোপলিটন, সায়েন্স সিটি, রুবি সহ দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপকহারে স্বর্ণগোধিকা শিকার চলছে।

চোরাকারবারিদের কাছে এই নিরীহ প্রাণীটিকে শিকার করা বা ধরা খুবই সহজ কাজ। কারণ, প্রখর দিনের আলোতে এই স্বর্ণগোধিকাদের চলাফেরা করতে দেখা যায়। শুষ্ক চাষের ক্ষেত থেকে বালি-মাটিযুক্ত অঞ্চল এবং জলাভূমির আশেপাশের গুল্মঝোপ হল এদের প্রিয় বাসভূমি। দিনের আলোতে বিভিন্ন জলাশয়ের জলে এই স্বর্নগোধিকাদের মাথা উঁচু করে সাঁতার কাটতে দেখা যায়। ফলে সহজেই এরা শিকারিদের নিশানা হয়। উত্তর এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার বিস্তীর্ণ জলাভূমি অঞ্চলে, এমনকি সুন্দর বাদাবনের নানান খাড়ি অঞ্চলে একসময় প্রচুর সংখ্যায় স্বর্নগোধিকার দেখা মিলত। অসম্ভব পরিবেশগত সহনশীলতা থাকার দরুন সুদৃঢ় ইন্ডাস নদী থেকে গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমিতে এরা সমান সাবলীল। ভারতের পাশাপাশি পাকিস্থান, নেপাল এবং বাংলাদেশে স্বর্ণগোধিকা দ্রুত কমে আসছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ৭০-৯২ সেন্টিমিটারের এই ছোট্ট চার-পেয়ে সরীসৃপ প্রাণীটি দিনের আলোতে অসংখ্য ছোট ছোট ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে কৃষিক্ষেত্র তথা বাস্তুতন্ত্রের সাম্যতা বজায় রাখে। প্রজনন ঋতুতে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ এবং পাখির ডিম খেয়েও এরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। আমাদের পশ্চিমবাংলায় সাধারণত জুন-জুলাই মাস বা বর্ষার শুরুতে স্বর্ণগোধিকা প্রজননে লিপ্ত হয়। তীক্ষ্ণ নখের আঁচড়ে স্ত্রী স্বর্ণগোধিকা একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজে সুড়ঙ্গ আকৃতির গর্ত বানিয়ে ফেলে। ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তটি বেশ চওড়া বা গোলাকৃতির হয়। ওই নতুন বাসাতেই স্ত্রী প্রাণীরা একসঙ্গে প্রায় ২০-৩০ টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে ছানা ফুটতে প্রায় ৫ মাস লেগে যায়। ফলে খুব একটা দ্রুত বংশবিস্তার হয় না। এছাড়াও প্রকৃতিতে এদের স্বাভাবিক আয়ু বড়জোর ৪-৫ বছর। এমন, একটি উপকারি প্রাণীর নির্বিচার হত্যা এবং তার দেহাংশের ব্যবসা না থামলে, কয়েক দশকের মধ্যেই বাংলা থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে স্বর্ণগোধিকা!