Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

সরকার নির্বিকার !
চরম অবহেলার শিকার মহিলা মৎসজীবী

স্টাফ রিপোর্টার, সুন্দরবনঃ প্রায় ৯৫০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ সুন্দরবনকে যত কাছ থেকে দেখা যায় ততই আতঙ্কে বিস্মিত হতে হয়। সমগ্র এলাকার প্রায় ৪৫০০ বর্গ কি.মি. রয়েছে শুধু বাদাবনের জঙ্গল আর জলের সমারোহ। বাকি প্রায় ৫০০০ বর্গ কি.মি. জুড়ে রয়েছে ৩৭ লাখ মানুষের বসতি। সম্প্রতি আর.বি.আর.এফ. এর সমীক্ষা অনুযায়ী পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ সুন্দরবনের ১০,০০০ সংখ্যারও বেশি মহিলা মীনধরা তথা মাছ ধরা-কেই জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। শুধুমাত্র সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকেই রয়েছেন ১৭০১ জন মহিলা মৎস্যজীবী। এই মীন ধরার প্রচলন রয়েছে সেই ৭০-এর দশক থেকেই। তবে আগে এটা শুধুই ওপার বাংলায় সীমাবদ্ধ ছিল। ধীরে ধীরে সেই প্রথা এপার বাংলাতেও চলে আসে।প্রথম শুরু হিঙ্গলগঞ্জে। তারপর তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে গোসাবা, বাসন্তী, কুলতলী, পাথরপ্রতিমা, নামখানা, সাগর এবং কাকদ্বীপ ব্লকে।চারিদিকের জল আর জঙ্গলের বিস্তির্ণ এলাকায় এই ৩৭লাখ মানুষ দু’বেলা পেট ভরানোর তাগিদে যে অমানুষিক কায়িক শ্রম করে তা আমাদের মত সভ্য সমাজে উন্নয়নের চাদরে মোড়া নির্বিঘ্নে থাকা মানুষের কাছে যেন একটা দুঃস্বপ্ন। আমাদের কাছে এই সমস্ত বিষয় শুধুমাত্র চায়ের বৈঠকে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

গোসাবা ব্লক তথা সমগ্র সুন্দরবনের আধিকাংশ মহিলাই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনের বেশীরভাগ সময়টা ডাঙার থেকে বেশী জলের মধ্যে অতিবাহিত করেন কেবলমাত্র কখনো কাঁকড়া, কখনো মাছ কিংবা কখনো বাগদা চিংড়ির মীন ধরার আশায়। জলেই যেন এদের সংসার। “জলই জীবন”- আক্ষরিক অর্থে ‘সোঁদরবনের’ মানুষের ক্ষেত্রে এটাই যেন একমাত্র সত্যি। ভয়াবহ দারিদ্র আর আপুষ্টি এদের নিত্যদিনের সঙ্গী। মধ্য বয়সেই এরা আজ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা।

দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়ার জোগাড়ের তাগিদেই সুন্দরবনের সমস্তরকম বাধা-বিপদ-ভয়কে উপেক্ষা করেই জলে নামতে বাধ্য হয়েছে এই সমস্ত মহিলা মৎসজীবীরা। কিন্তু প্রকৃতি এদের জলের মাছ-কাঁকড়া-মীন ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। সামান্য নিরাপত্তাটুকুও নয়। সামান্য সংসার চালানোর তাগিদে প্রায়শই এরা বাঘ, কুমীর বা বিষধর সাপের শিকার হয়। দারিদ্র, অপুষ্টি আর প্রাণ হারাবার ঝুঁকির মত বিপদে ফেলেই যেন ক্ষান্ত হয়নি প্রকৃতি। দিনের বেশীরভাগ সময় কোমর সমান নোনাজলে থাকার ফলে এই সকল মহিলা মৎসজীবীদের আধিকাংশই জরায়ু ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হন। শুধু তাই নয় চক্ষু, চর্ম প্রভৃতি বিভিন্ন রকম রোগেও ভোগেন।

সাম্প্রতিক কালে আর.বি.আর.এফ. গোসাবা ব্লকের ১৮টি প্রত্যন্ত দ্বীপে এই সমস্ত হতদরিদ্র মহিলা মৎসজীবীদের উপর এক সমীক্ষা চালায় যা এর পূর্বে অন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা করেনি বা উদ্যোগও নেয়নি। সুন্দরবনের সমস্ত রকমের বাধা-বিপত্তিকে অগ্রাহ্য করে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চার মাসেরও বেশিসময় ব্যাপী সমীক্ষা চালান আর.বি.আর.এফ. এর গবেষণাকারী দল। এই দীর্ঘ এবং বিশদ সমীক্ষায় গোসাবা ব্লকের মোট ১৭০১ জন মহিলা মৎসজীবীদের শুধু ছবিই নয় তাদের পরিবার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আর্থিক অবস্থা বিষয়ক সমস্ত রকম বিবরণ নথিভুক্ত করা হয়েছে ভবিষ্যতের সুবিধার জন্য। এই সমীক্ষায় প্রাপ্ত সকল তথ্যানুযায়ী একটি ‘প্রোজেক্ট রিপোর্ট’ তৈরী করা হয় যাতে অবিলম্বে প্রকল্পটিকে বাস্তব রূপ দেওয়া যায়। কিন্তু কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তারা বিভিন্ন কারণে এবিষয়ে অনিচ্ছা প্রকাশ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আর.বি.আর.এফ. এর বিভিন্ন এলাকা ভিত্তিক তৈরী প্রকল্পে বিশ্ব-ব্যাংক আর্থিক সহায়তার সম্মতি প্রকাশ করলেও রাজ্য-সরকারের এবিষয়ে কোন স্বদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না। ‘সোঁদরবন’ এর মহিলা মৎসজীবীদের এই ভয়ঙ্কর শোচনীয় অবস্থা দেখেও সরকারের ঔদাসিন্য যে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহলকেই আশ্চর্য করছে তাই নয় জনসাধারণকেও ক্ষুব্ধ করে তুলছে।

সুন্দরবন হল এক জটিল জৈব-বৈচিত্রের আধার যা কিনা মানুষের দৈনন্দিন কর্মকান্ডে নানান ভাবে শোষিত হচ্ছে। যার অন্যতম উপসর্গ হল মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত বা বাঘে-মানুষে লড়াই, কখনো বা জলের কুমীর। আর.বি.আর.এফ. গোসাবা ব্লকের অন্তর্গত যে ১৮টি প্রত্যন্ত দ্বীপে সমীক্ষা চালান সেগুলি সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের সবথেকে কাছে। ফলে প্রায়শই মানুষ-বাঘের সংঘাত পরিলক্ষিত হয়।

সুন্দরবনের মাটি বেশি লবণাক্ত হওয়ার জন্য এখানে চাষবাস করা যায়না। একমাত্র বছরের যে সময়টায় বৃষ্টি(মিষ্টিজল)হয় সেই সময়তেই ওই সব জমিতে ফসল ফলানো যায়। সুন্দরবনের এই সব জমিকে ‘সিঙ্গল ক্রপ সয়ল’ বলা হয়। বছরের বাকি সময়টা ওই জমিগুলোতে নোনাজল জমিয়ে রেখে মাছ চাষ করার চেষ্টা করে স্থানীয় মানুষ। এছাড়াও কাঁকড়া, মীন প্রভৃতি ধরে অতি কষ্টে জীবন চালায়। বর্তমান উপকূল রক্ষা আইন অনুযায়ী এই মীন ধরাকে এক অর্থে বেআইনি বলা চলে। যদিও রূঢ় বাস্তব, দুর্বিষহ দারিদ্রতা এবং তৎজনিত মানবিক কারণে সেই আইন এখনি পুরোপুরি কার্যকরি করা সম্ভব হচ্ছে না।তবে এরকম অমানুষিক কায়িক শ্রম করেও দিনে এদের গড় আয় হয় ৫০-৬০টাকা। কিন্তু তাই দিয় কি এই একবিংশ শতাব্দীতে সত্যিই সংসার চলে! এখানেই ব্যাপারটার শেষ নয়। অধিকাংশ সময় নোনাজলের মধ্যে নিমজ্জিত থাকার ফলে শুধু যে জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তাই না অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী বা মৃত শিশুরও জন্ম দেয়।

সংসার চালানো মুখের কথা নয়! সংসার চালাতে গেলে লাগে অসম্ভব ধৈর্য, অক্লান্ত পরিশ্রম আর প্রচন্ড সাহস- এই কথাটাই সুন্দরবনের এইসকল মহিলা প্রত্যেক দিন চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। পরিবারের নূন্যতম চাহিদা পূরণের এবং বেঁচে থাকার তাগিদে এই সমস্ত মহিলা মৎসজীবীরা যে দৈনন্দিন কায়িক শ্রম করে চলেছে তা সত্যিই কুর্নিশ যোগ্য। অতি শীঘ্র এই আসীম সাহসী এবং সংগ্রামী মহিলাদের বিকল্প জীবিকা ও আর্থিক পুনর্বাসনের প্রয়োজন যাতে এরা সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারে সুন্দরবনে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সরকার আসে সরকার যায় ঠিকই কিন্তু এদের অবস্থার কোনো পরিবর্তণ হয়না। আর সরকার যদি সুন্দরবনের প্রতি এইভাবেই উদাসীন থাকে তাহলে খুব বেশিদিন সুন্দরবনের ওই সমস্ত ৩৭ লাখ মানুষ সুস্থ অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারবেনা।

বিস্তারিত ...