Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

ধানসিমলার কমল কথাঃ
হাতি বাঁচাতে জীবন বাজি

শমীক গুপ্ত, নেচার ইণ্ডিয়ান, ধানসিমলা, বাঁকুড়াঃ বন এবং বুনো হাতি সংরক্ষণে নিজের জীবন বাজি রেখেছে ধানসিমলার তরুণ তুরকী কমল ব্যানার্জ্জী। বছর পঁয়ত্রিশ-এর দীর্ঘকায় ছিপছিপে যুবক রাতেদিনে ছুটে বেড়ায় বন-বনান্তে, প্রত্যন্ত গ্রামান্তরে। লাভ নেই, পারিশ্রমিক নেই, নেই অনুপ্রেরণা কিংবা স্বীকৃতি। যা আছে তা হল প্রতি মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি, অর্থব্যয়, আর নিত্যনতুন ঝক্কি সামলানোর গুরুদায়িত্ব! না, এসব নিয়ে ভাবতে রাজি নয় ধানসিমলার তরুণ। সলজ্জভাবে হেসে বলে, “তাতে কি হয়েছে; হাতিদের ওপর অত্যাচার করা চলবে না, আর জঙ্গল কাটতে দেব না”।

আরে বাবা ! লোকটা বলে কী? দিনআনা পরিবারের আয় বলতে সামান্য আট বিঘা জমির ধান। ফি-বছর যার অর্দ্ধেকের ওপর খেয়ে যায় দলমার দামালরা। “খাচ্ছে খাক, ওদের তো পেট আছে?” আরে বাবা! ‘এছেলে তো হাটকে’। “সরকারি ক্ষতিপূরণ তো নিশ্চয়ই পাও?” – জানতে চাইলে ও বলল “না, হয়তো পেতাম কোনদিন দরখাস্ত করিনি।” তাহলে চার বিঘে জমির ধানে সারা বছর চলে কি করে? “স্যার ভগবানের আর্শীবাদে আমাদের চলে যায়। বিয়ে থা করিনি। কবে হাতি মেরে দেয় তার ঠিক নেই কো। কি হবে টাকা নিয়ে!”

চমকে যাইনি। থমকে গেলাম। বুঝলাম, বিরল প্রাণী থুরি ব্যতিক্রমি মানুষ, একটা বড় হৃদপিণ্ড আছে কমলের। আর আছে অসীম সাহস, প্রেম, এ প্রেম সর্বজনীন। কেবল মানুষের প্রতি নয়, গাছপালা, জীবজন্তু – জগতের যেখানে প্রাণের স্পন্দন আছে, সেখানেই আছে কমলের প্রেম। স্বাভাবিকভাবেই, এ প্রেমের মূল্যায়ণ হয়নি, কস্মিনকালেও তা হবে না। প্রেম আর বাস্তবতা সমান্তরাল লাইনে এগিয়ে যাবে। অথচ কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারবে না এটাই অধিবাস্তব!

দেখতে দেখতে দশ বছর পেরিয়ে গেছে। হাতি খেদানো হল কমলের রোজনামচা। দিনে রাতে ইঙ্কাডা-র গ্রামে গ্রামে। ইঙ্কাডা হল বাঁকুড়া উত্তর বনবিভাগের একটা ছোট্টো ফরেস্ট বিট, যা কিনা আবার সোনামুখী বনক্ষেত্রের আওতাধীন। একটা ছোট্ট নীচু রেলস্টেশন সিঁড়ি বেয়ে ট্রেনে উঠতে হয়। স্টেশনের নাম ধানসিমলা। বাঁকুড়া সদর থেকে ট্রেন পথে প্রায় দুই ঘন্টার পথ ধানসিমলা। ফাঁকা শুনশান রেলস্টেশনে গুটি কয়েক স্থানীয় যাত্রী ইতস্তত ঘোরাফেরা করছে। একটাই ট্রেন দিনে মাত্র তিনবার যাতায়াত করে। কমল তাদেরই মত এক সাধারণ গ্রামবাসী। আট বিঘে ধান জমি আছে, ফি-বছর যার অর্ধেকই হাতি খেয়ে যায়।

প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে দলমার হাতিদের নিয়ে দক্ষিণবঙ্গে সমস্যা বহুদিন ধরেই চলে আসছে। বলতে গেলে সেই ১৯৮৭ সাল থেকে। প্রতি বছর জুন-জুলাই মাসে প্রায় ১০০ হাতির দল পার্শ্ববর্তী ঝাড়খন্ড রাজ্য থেকে পশ্চিমবাংলায় চলে আসে। তছনছ করতে থাকে পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়ার অসংখ্য গ্রাম। যদিও হাতিদের এই যাযাবর বৃত্তি কোন নতুন কথা নয়। অতিরিক্ত খাবারের প্রয়োজনে এদের সারা বছর ধরে বহু পথ অতিক্রম করতে হয়। তবে এক্ষেত্রে যা বিস্ময়কর তা হল যে এখন আর তারা পুরোপুরি জঙ্গলের খাওয়ার উপর নির্ভর করছে না। বরং সহজলভ্য রবিশস্যের দিকে তাঁদের ঝোঁক বেশি। ফলে সংশ্লিষ্ট মানুষ হাতির সংঘাত বেড়েই চলেছে।

কমলের গ্রামে যেতে গ্রামবাসীরা জানাল যে প্রতি বছর এই যাযাবর হাতির দল বিষ্ণুপুর, জয়পুর হয়ে দ্বারকেশ্বর নদী পেরিয়ে প্রকাশ ঘাট, সর্বমঙ্গলা ঘাট, কুসুর দ্বীপ জঙ্গল পেরিয়ে ধানসিমলায় ঢোকে। এখানেই তারা নাকি সবচেয়ে বেশি দিন কাটায়। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমানও বিস্তর। ধান সিমলায় দীর্ঘ সময় কাটানোর পর হাতির দল বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী, শালতোড়া, বরজোড়া হয়ে গঙ্গাজলঘাটি পর্যন্ত এগিয়ে যায়। কিন্তু ফিরতি পথে আবার ওরা ধানসিমলায় এসে ঘাঁটি গাড়ে। কমলের মতে যেহেতু দু-দুবার ধানসিমলায় অবস্থান করে সেহেতু এখানকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমান জেলার অন্য কোন জায়গার সাথে তুলনীয় নয়। মাত্র চার মাসেই সোনামুখীতে প্রায় ১২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দিনরাত হাতি তাড়িয়েও সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না কমলরা। তাঁর মতে, ‘সীমিত সামর্থ্য নিয়ে আমরা আর কি-ই বা করতে পারি?” কমল আরও জানায় যে, হাতি তাড়ানোর জন্য বনদপ্তর থেকে যে জ্বালানি দেওয়া হয় তাতে নাকি অত্যধিক জল মেশানো থাকে। ফলে সময়মত তা জ্বলে না ওঠায় তাদের বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়াও শস্য ক্ষতির কারণে বনদপ্তর থেকে যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় তা যতসামান্য। এক বিঘে জমির ধান নষ্ট হলে চাষির প্রায় দশ হাজার টাকা ক্ষতি হয়। সেখানে সে ক্ষতিপূরণ পায় মাত্র ৫০০ টাকা। তাঁর দাবি, “আমার কোন ক্ষতিপূরণের বা পারিশ্রমিকের প্রয়োজন নেই কিন্তু সরকার যেন অবিলম্বে চাষীদের ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বাড়ায় এবং যথাসময় তা দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

হাতি খেদানো যে কত ভয়ঙ্কর কাজ তা বুঝিয়ে বলতে কমল জানায়, “এই দেখুন বেশ কিছু হাতি সারা বছরই বাঁকুড়া জেলায় থেকে যায়। এরা যখন গ্রামে ঢুকে পড়ে তা হয় মারাত্মক কারণ এরা ‘হুলাপার্টি’, আগুন, মশাল ইত্যাদির সঙ্গে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে। ফলে খেদানোর সময় ভয় তো একেবারেই পায় না। উল্টে তেড়ে আসে। এটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে ২০১১ সাল থেকে নেচার ইন্ডিয়ানের তরফে বারবার বনদপ্তরকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, এই অতিরিক্ত হাতিদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে উপদ্রুত তিনটি জেলায় ‘সেমি ক্যাপটিভ’ অবস্থায় রাখা হোক। এতে করে একদিকে যেমন মানুষ হাতির সংঘাত কমবে অন্যদিকে তেমনি বিভিন্ন জায়গায় বন্যপ্রাণী পর্যটনের সুযোগ বাড়বে। দক্ষিণবঙ্গে হাতি সমস্যা সমাধানের এটাই একমাত্র পথ বলেই সংরক্ষণবাদীরা সহমত পোষণ করেছেন। সরকারের তরফে কতদিনে যে সে বোধোদয় হবে-সেটাই এখন দেখার আর ততদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে হাতিদের তাড়িয়ে বেড়াবে কমলের মত পশুপ্রেমিরা!