Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

ঢিলেঢালা সংরক্ষণ :
বিকল্প বাসস্থানের খোঁজে সুন্দরবনের নোনা জলের কুমির

স্টাফ রিপোর্টার, নেচার ইন্ডিয়ান : সুন্দরবনে নোনা জলের কুমিরের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে বলেই শোনা যাচ্ছে সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে। সুন্দরবনের লোকেদের কাছে এই নোনা জলের কুমির আবার ‘মোহনার কুমির’ বলেও পরিচিত। একটু বইয়ের পাতা ওল্টালে এই নোনাজলের কুমিরের(বিজ্ঞানসম্মত নামঃ ক্রোকোডাইলাস পোরোসাস)প্রকৃত বাসভূমি সম্পর্কে একটা মোটামুটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। এদের প্রধানত দেখতে পাওয়া যায় অষ্ট্রেলিয়ার উত্তরভাগে, এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এবং ভারতের পূর্ব উপকূলবর্তী অঞ্চলে।অবশ্য তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে, ভারতেরউড়িষ্যা রাজ্যে ভিতরকণিকা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে সুন্দরবন অপেক্ষাকৃত বেশি সংখ্যক এই জাতের কুমির রয়েছে। শুধু তাই নয়, এই ভিতরকণিকা অভয়ারণ্যে ৭ মিটার লম্বা কুমিরেরওসন্ধান পাওয়া গেছে। একটা সময় ভারতীয় সুন্দরবনে বর্তমান অপেক্ষাকৃতবেশি সংখ্যক নোনা জলের কুমির ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আজ তাধীরে ধীরে প্রায় বিলুপ্তির পথে। বিশেষজ্ঞ্ররা এর কারণ হিসেবে শুধু ভূতাত্ত্বিক বা নৃতাত্ত্বিক ব্যাপারকেই দায়ী করছেন না, তাঁদের মতে প্রকৃতিতে অকারণে মানুষের হস্তক্ষেপ এর জন্য দায়ী। আর সেই কারণেই নোনা জলের কুমির উপযুক্ত বাসস্থানের সন্ধানে সুন্দরবন ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দিচ্ছে।

মায়ানমারের ইরাউডি ব-দ্বীপে এখনো বেশ কিছু স্থায়ী সংখ্যক নোনা জলের কুমির দেখা গেলেও তারাও যে বিপদমুক্ত তা আখ্যা দেওয়া যায় না মোটেই। আবার মালয়শিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াতে এদের অনিয়মিত বিস্তার দেখা যায় যেমন কিছু কিছু অঞ্চলে এরা সংখ্যাতে বেশি(বর্নিও দ্বীপ) আবার কোথাও এরা সংখ্যাতে কম(ফিলিপাইন্স দ্বীপ)। কিন্তু ভানুয়াতু অঞ্চলে ইতিমধ্যেই এরা বিলুপ্তপ্রায়ের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, এখানে মোটে তিনটি কুমির এখনো অবশিষ্ট আছে। আবার পালাউ-তে এদের সংখ্যা তিনটির বেশি হলেও সেই সংখ্যাকে মোটেই নিরাপদ বলা চলে না।

মাঝে মধ্যে এরা দীর্ঘ সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার কারণেই অনেক সময় এদের নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য জায়গাতেও দেখতে পাওয়া যায়। খুব সম্ভবত বেশি দূরত্বে যাওয়ার পর বিশ্রাম নেওয়ার জন্যই হয়ত এরা অচেনা জায়গায় আশ্রয় নেয়। এই ঘটনা বিরল নয়, অতীতেও ঘটেছে বহুবার। যেমন, নিউ ক্যালেডোনিয়া, ইয়োজিমা এমনকি জাপানের অপেক্ষাকৃত হিমশীতল সমুদ্রেও,যা প্রকৃতপক্ষে এদের স্বাভাবিক বাসস্থানের থেকে হাজার ক্রোশ দূরে, সেখানেওএদের কখনো কখনো একক ভাবে দেখা গেছে।শুধু তাই নয়, গ্রীষ্মকালীন ঋতুতে এবং বর্ষাকালের প্রারম্ভকালেও এদেরকে নিজস্ব বাসস্থান ছাড়া অন্য মোহনাতে দেখা যায়(যেমন, এদেরকে ফ্রেজার দ্বীপে দেখা গেছে বহুবার)। বিশেষজ্ঞদের মতে এদের এই জায়গা পরিবর্তনের প্রবণতা হয়ত কেবলমাত্র আবহাওয়া জনিত কারণই নয় খাদ্যের সমস্যা এবং জলের লবণাক্ততাও এর অন্যতম কারণ।

এই প্রজাতির কুমিররা মূলত ক্রান্তিয় আর্দ্র ঋতুতে মিষ্টিজলের খাঁড়ি বা নদীতে বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করে। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় এটাই হয়ত এই প্রজাতির কুমিরের আদর্শ বাসভূমি।শুষ্ক আবহাওয়ার সময় এরা খাঁড়ির নিচের দিকে নেমে আসে যেখানে জলের গভীরতা অপেক্ষাকৃত বেশী পায়। আবার কখনো কখনো আরও গভীর সমুদ্রেও পাড়ি জমায়। নোনা জলের কুমিররা একে অপরের বিচরণক্ষেত্র সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। এরা কেউ কারোর এলাকায় সাধারণত প্রবেশ করেনা। একটু বেশী প্রভাবশালী পুরুষ কুমিরটি খাঁড়ির সবথেকে উপযুক্ত জায়গাটি নিজের দখলে রাখে। ফলে ছোট শাবক কুমিরটি খানিকটা বাধ্য হয়েই স্বল্প জলের খাঁড়িতে ঘোরাফেরা করে। তবে কদাচিৎ সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেলেও আবার ফিরে আসে। পর্যবেক্ষকদের মতেপৃথিবীর দীর্ঘ অঞ্চল জুড়ে এদের বিস্তৃতির এটাই হয়ত অন্যতম একটি কারণ। এরা জলে একটানা ঘন্টায় ১৫ থেকে ১৮মাইল সাঁতার কাটতে পারলেও খরস্রোতা নদীতে বা সামুদ্রিক ঢেউয়ের মুখে বড় জোর ঘন্টায় ২থেকে ৩মাইল যেতে পারে।

গবেষকদের মতে নোনা জলের কুমির স্বভাবগত দিক থেকে খুবই অলস প্রকৃতির হওয়ার ফলে এরা বেশ কিছুদিন না খেয়েও বেঁচে থাকতে পারে।এরা জলের মধ্যেই দিনের বেশীরভাগ সময় অতিবাহিত করার ফলে এই সময়টা খুব একটা শিকার ধরে না। এরা শিকার ধরার জন্য রাতের অন্ধকারকেই বেছে নেয়। তবে জলে বিন্দুমাত্র বিপদের সংকেত পেলে এরা খুব দ্রুত জলের গভীরে ডুব দেয়। নোনা জলের কুমির যে প্রাণীটিকে শিকার করেতার মৃত্যু অবধারিত বলেই এদের শিকার ধরার পদ্ধতিকে ‘ডেথ রোল’ বলে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কুমির সাধারণত ওজনে ৬০০ থেকে ১০০০ কিলোগ্রাম এবং দৈর্ঘ্যে ৪.১ থেকে ৫.৫ মিটার পর্যন্ত হয়। তবে নোনা জলের স্ত্রী কুমিরটি পুরুষ কুমিরের থেকে আকৃতিতে অনেকটাই ছোট হয়। স্ত্রী কুমির দৈর্ঘ্যে ২.১ থেকে ৩.৫ মিটার এবং ওজনে খুব বেশি হলে ৪৫০ কিলোগ্রাম হয়। ‘গিনিস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড’ এর তথ্যানুযায়ী উড়িষ্যা রাজ্যের ভিতরকণিকা অভয়ারণ্যে ৭ মিটার দীর্ঘ কুমিরের অস্তিত্ত্ব বর্তমান(পূর্বে উল্লেখিত)।

ব-দ্বীপ তথা খাঁড়ির বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় এই নোনা জলের কুমিরের বিশেষ অবদান আছে। সমুদ্র থেকে যে সমস্ত রাক্ষুসে মাছ(যেমন, হাঙর)নদীতে এসে অন্যান্য মাছের প্রজাতিকে শেষ করে দেয়, সেই সমস্ত রাক্ষুসে মাছের ভক্ষক হল এই নোনা জলের কুমির। ফলত স্বাভাবিক ভাবেই সুন্দরবন থেকে এই জাতের কুমির বিলুপ্ত হয়ে গেলে সেখানে অনায়াসে হাঙরের মত রাক্ষুসে মাছ প্রবেশ করতে পারবে যা সুন্দরবনে বসবাসকারী মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর হবে। বিশেষজ্ঞদের কথা অনুযায়ী এমতাবস্থায় নোনা জলের কুমির সংরক্ষণের জন্য অবিলম্বে সরকারের উচিত অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া যাতে সুন্দরবন অঞ্চল এই কুমিরের জন্য উপযুক্ত বাসস্থান হয়ে ওঠে।