Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

সুন্দরবনঃ কেন গ্রামে বাঘ বারবার
কুয়াশা অন্যতম কারণ, এ্যাডভেঞ্চারও

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান, সুন্দরবনঃ সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামে বাঘ পড়ার ঘটনা নতুন নয়। প্রবহমান কাল ধরে চলে আসছে। এছাড়াও, পেটের জ্বালায় যারা বনের মধ্যে চিংড়ি, কাঁকড়া ধরতে যান কিংবা মধুর খোঁজে, তারা প্রায়শই বাঘের কবলে পড়েন। বিগত ১১ বছরে (২০০০-১১) বাঘের আক্রমণে ৯১ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গবাদি পশু মারা পড়েছে ৬০ টি, জঙ্গল থেকে বাঘ বেরিয়ে আসার ঘটনা ঘটেছে ৮৮ বার। গ্রামে বাঘ ঢুকেছে ৬৫ বার। যদিও এই সংখ্যাতত্ত্বের সামান্য এদিক ওদিক হতে পারে। প্রশ্ন সেটা নয়। প্রশ্ন হল, বাঘ গভীর অরণ্যের জীব। পারতপক্ষে ঘন জঙ্গল ছেড়ে বেড়োয় না। কোনভাবে বিরক্ত হলে, আরও গভীর অরণ্যে ঢুকে যায়। তাছাড়া, সারা পৃথিবীতে যত জায়গার বাঘের বাসভূমি আছে, সব জায়গাতেই বাঘের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মোটামুটি একইরকম। অঞ্চল বিশেষ তার বড় একটা তারতম্য হয় না। তাহলে সুন্দরবন কেন?

এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে বিষয়টির প্রেক্ষাপট জেনে নেওয়া দরকার। যতদূর জানা যায়, সুন্দরবনের বয়স ৭০০০ বছরের আশেপাশে। তার আগে নাকি সাগরের বিস্তৃতি ছিল আরও ওপরের দিকে। উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর পর্যন্ত সমুদ্রের ব্যাপ্তি ছিল। অর্থাৎ প্রায় হিমালয় পাদদেশ। যা কিনা উচ্চ-বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চল। একাধিক নদ-নদী দুর্বার গতিতে পাহাড় থেকে নেমে এসে সমুদ্রের দিকে ধেয়ে যেত। তখন সেখানে গভীর অরণ্যের বিস্তার ছিল। ছিল নদীভিত্তিক ঘাসজঙ্গল।

আরও একটু গভীরে যাওয়া যাক। ধরে নেওয়া যেতে পারে; উত্তর চীন, সাইবেরিয়া অথবা আরও একটু ওপরে বাঘেদের উৎপত্তিস্থল। অর্থাৎ, শীতপ্রধান অঞ্চল। প্রাকৃতিক নিয়মে বস্তু তার ঠান্ডা অবস্থা থেকে গরমের দিকে যেতে চায়। জীবের ক্ষেত্রেও কিন্তু এই নিয়মের বড় একটা ব্যতিক্রম ঘটে না। সেই যুক্তিতে, শীতপ্রধান দেশ থেকে বাঘেরা ক্রমশ নিচের দিকে নামতে শুরু করে। নিবন্ধের ব্যাপ্তি ছোট রাখতে, পৃথিবীর অন্যন্য দেশে বাঘেদের বিস্তার নিয়ে বিশদ আলোচনায় গেলাম না।

এবার পথ কোথায়? সামনে সুবিশাল হিমালয়। তারই ফাঁক-ফোকর(পাস্)খুঁজে উত্তর থেকে ক্রমে আরও নিচের দিকে নামতে থাকে। একদিকে হিমালয় পাদদেশের বিস্তীর্ণ বনভূমি, ঘাস জঙ্গল, অন্যদিকে শিকার প্রাণীর বৈচিত্র্য। ফলে, সেইসময় গোটা হিমালয় পাদদেশে প্রচুর বাঘের উপস্থিতি ছিল। অসম, অরুণাচল সহ উত্তর-পূর্বের সবকটি রাজ্যে প্রচুর সংখ্যায় বাঘ ছিল। যার মধ্যে অন্যতম হল উত্তরবঙ্গ। উত্তরবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ হয়ে বাঘেরা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।

যতদূর জানা যায়, এরপর অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে হিমালয়ের পুনর্গঠন এবং সমুদ্রের অবস্থান পরিবর্তনের সময় ওই অঞ্চল ‘নবদ্বীপ’ নামকরণ হয়েছিল। কারণ, ‘দ্বীপ’ তো সমুদ্র থেকেই ওঠে! খুব সম্ভবত হিমালয় পুনর্গঠন এবং সমুদ্রের অবস্থান পরিবর্তনের সময় ওই অঞ্চল (নবদ্বীপ) প্রথম জেগে ওঠে এবং সেখানে মানুষ বসবাস শুরু করে। তাই হয়ত ‘নুতুন দ্বীপ’ বা ‘নবদ্বীপ’ নামকরণ হয়েছিল। যাইহোক, সমুদ্র সরে এল বর্তমান অবস্থানে। আজকের বঙ্গোপসাগর। অতএব নদীর আর উপায় কি? তাকে তো সমুদ্র সন্ধানে যেতেই হবে। কিন্তু যাবে কিভাবে? এ তো সমতলভূমি। ঢাল ্যৎসামান্য। অগত্যা ওই সমস্ত নদনদী প্রথমে মধ্যগতি অতঃপর নিম্নগতিতে ক্রমশ চওড়া হতে হতে এসে মিশতে থাকল বঙ্গোপসাগরের বর্তমান অবস্থানে। তৈরি হল বিস্তীর্ণ নদী অববাহিকা। গোটা বাংলা জুড়ে। বিস্তীর্ণ বনভূমি তৈরি হল। বাড়তে থাকল ঘাসজঙ্গল (রিভারাইন ফরেস্ট)। বহু তৃণভোজী প্রাণী আশ্রয় নিল। বাঘেদের পোয়াবারো। ‘যেখানে খুশি যাইতে পারি, যা চাই খুশি খাইতে পারি’- তারা ভুতের রাজার বর পেল। সারা বাংলা দাপিয়ে বেড়াতে থাকল প্যানথেরা টাইগ্রিস-এর দল।

তবে এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে। তখনওকিন্তু বাঘেরা সুন্দরবনের বাদাবনে প্রবেশ করেনি। আর করবেই বা কেন? একে লবণাক্ত জল, মুহুর্মুহু জোয়ার-ভাটার দাপাদাপি এবং ঘাসজঙ্গলের অনুপস্থিতি। কোন তৃণভোজী প্রাণী সেখানে থাকবে না। অতএব খাবার প্রতুলতা। এর ওপরে রয়েছে পায়ের নিচে শ্বাসমূলের খোঁচা। না, না! বাঘেরা এত বোকা নয়। সুন্দরবন ছাড়া পৃথিবীর আর কোনও বাদাবনে বাঘেরা বসবাস করে না। বরঞ্চ সুন্দরবনের খানিকটা উপর পর্যন্ত (বর্তমানে পিয়ালি) নদী অববাহিকায় প্রচুর ঘাসজঙ্গল ছিল। বাঘেরাও সেখানে নিরুপদ্রবে বসবাস করত। সেখানে শিকার প্রাণীর বৈচিত্র্যও ছিল। বারশিঙা, বুনো মোষ, কাকর হরিণ, সম্বর, হগ ডিয়ার, বুনোশুকর- আরও অসংখ্য তৃণভোজীরা প্রচুর সংখ্যায় সেখানে ছিল। এই সবই ১৭৭৫-এর আগের ঘটনা। অর্থাৎ ইতিহাস। গোল বাধল তার পরে।

১৭৭৫ নাগাদ ইংরেজ সরকার ১৪৪ জন জমিদারকে সুন্দরবনের পাট্টা দিয়ে বসল। শুরু হল ব্যাপক বনসংস্কার। ঘাসজঙ্গল দিয়েই তার সূত্রপাত হল। কারণ শুরু তো ওপর থেকেই হবে। বাদাবন অনেক নিচে! প্রায় দশ হাজার বর্গকিমি সাফা হয়েছে। সাফাই অভিযান চলেছে প্রায় ২০০ বছর। অনিবার্য কারণে সুন্দরবন থেকে অসংখ্য তৃণভোজী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রচন্ড সহন ক্ষমতা থাকার দরুন কোনক্রমে টিকে গেছে বাঘ, চিতল, বুনোশূকর এবং বাঁদর(র্যে সাস্) কিন্তু এরা থাকবে কোথায়? জঙ্গল সাফা হয়ে ওপরের দিকে চাষবাষ করছে মানুষ। অগত্যা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে নদী, খাড়ি পেরিয়ে এরা একেবারে সমুদ্র উপকূলের বাদাবনে গিয়ে পড়ল। স্ব-ইচ্ছায় মোটেই নয়। নয় বিবর্তনের ধারায়। একেবারে নিরুপায় হয়ে বাদাবনকে তাদের বাসভূমি বলে মেনে নিতে হয়েছে। একে “ফোরসড হ্যাবিটেট” বলা যেতে পারে। আন্দামানে নির্বাসিত আদিম জনগোষ্ঠী জারোয়া, সেন্ট্রিনালি, ওঙ্গি, গ্রেট আন্দামানিস, সম্পেন প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর মত একই পরিণতির শিকার সুন্দরবনের বড়েমিঞা। প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম চালিয়ে আজও তারা কোনক্রমে টিকে রয়েছে। সুন্দরবন কোনদিনই বাঘেদের প্রিয় আবাসস্থল ছিল না।আজও নেই। আর বাঘেদের স্বভাব বিচারে, বাদাবন কখনই তাদের আবাসস্থল হতে পারে না।

এ তো গেল প্রেক্ষাপট। এরপর এল রাজনৈতিক সমস্যা। দেশ ভাগ হয়ে গেল। সুন্দরবনের বেশিরভাগ অংশ চলে গেল বাংলাদেশে (দুই তৃতীয়াংশ)। বাংলাদেশের এই অংশকে বলা হয় পূর্ব সুন্দরবন। আমাদের অংশকে বলা হয় পশ্চিম সুন্দরবন। পশ্চিম বা ভারতীয় সুন্দরবনের মোট পরিমাপ প্রায় ৯৫০০ বর্গকিমি। যার মধ্যে ৫২৪০ বর্গকিমি বনভূমি ইতিমধ্যেই নিকেশ হয়ে গেছে। বাকি পড়ে রয়েছে আনুমানিক ৪২০০ বর্গকিমি। এর মধ্যে জলভাগ প্রায় ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৬৮০ বর্গকিমি। অতএব স্থলভাগের পরিমাপ ২৫২০ বর্গকিমি-এর বেশি নয়। এখানে মনে রাখতে হবে, এরমধ্যে সমুদ্র-উপকূলবর্তী বনভূমিতে (আনুমানিক ৩৫ শতাং) অতিরিক্ত লবণাক্ততা থাকার দরুন সেখানে ঘাস জঙ্গল প্রায় নেই বললেই চলে। ঘাস না থাকলে হরিণ অর্থাৎ শিকার না থাকলে বাঘ থাকবে না। অতএব সুন্দরবনে বাঘেদের বাসযোগ্য বনভূমির পরিমাপ কতটুকু? ১৬০০-১৭০০বর্গকিমি’রমধ্যে। তার ওপর, বনের উত্তর-পশ্চিম দিকে মানুষের বাস। অর্থাৎবাঘেদের হিসেবে উপদ্রুত অঞ্চল। এছাড়াও জালিকাবিস্তৃত জলাভূমির দুই পাশ মানুষের প্রতিনিয়ত যাতায়াতের জন্য বিঘ্নিত। কমপক্ষে ৫ লক্ষ মামুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জঙ্গলের ওপর নির্ভরশীল।

২৮৮৫ (জলভাগ) নিয়ে বর্গকিমি হল সংরক্ষিত অঞ্চল। সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্প। বাঘের জন্য বরাদ্দ ওইটুকুই। আক্ষরিক অর্থে আনুমানিক ১৫৫০ বর্গকিমি (জলভাগ ছাড়া)। দক্ষিণ ২৪ পরগণা ডিভিশন জুড়ে দিলে বড়জোর ১৭০০ বর্গকিলোমিটার। ভুলবশত, বাঘেরা যদি এই পরিসীমার বাইরে বেরিয়ে পড়ে, তাহলেই সমস্যা।আগে এই সমস্যা হত সুন্দরবনের উত্তরভাগে। এখন পশ্চিমভাগেও ছড়িয়ে পড়েছে।অর্থাৎ দক্ষিণ ২৪ পরগ্ণা। বাঘেদের এভাবে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসাকেই বলে ‘স্ট্রেইং’। শুধু বাঘ নয়, যে কোন বন্য জন্তুর ক্ষেত্রেই এই শব্দ ব্যবহৃত হয়। উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে গন্ডার, গৌর, লেপার্ড, নিয়ে একই সমস্যা রয়েছে। ব্যতিক্রম হাতি। কারণ হাতি হল যাযাবর প্রাণী। এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে যেতে এরা গ্রাম, শহর, রাজপথ সবই অতিক্রম করে। তাই হাতিদের ক্ষেত্রে ‘স্ট্রেইং’ শব্দটি অচল। বলা হয় ‘মাইগ্রেসন’।

এবার ব্যাঘ্র প্রকল্পের ভেতরে তাকানো যাক। প্রকল্পের ২৮৮৫ বর্গকিমি অঞ্চলকে দুভাগে ভাগ করা হয়। ওপরের দিকে ১৩৩০ বর্গকিমি হল ‘বাফার’ অঞ্চল। এই অঞ্চলে পর্যটনের চাপ মারাত্মক। প্রতি মুহুর্তে ভুটভুটি, ঢাকঢোল, কাঁসর, মাইক নিয়ে মানুষের উল্লাস চলতেই থাকে। ফলে, বাঘেদের পক্ষে এই ‘বাফার এরিয়া’ তে পাকাপাকিভাবে থাকা প্রায় অসম্ভব।অন্যদিকে যদি দেখা যায়, তাহলে সুন্দরবনের এই বাফার অঞ্চলই বাঘেদের উপযুক্ত বাসভূমি হতে পারে। এর প্রধান কারণ হল, ওপরের দিকে মিষ্টি জলের প্রবাহ (নদীর জল) অনেক বেশি। ফলে, ঘাস জঙ্গল তথা তৃণভোজীদের সংখ্যাও অপেক্ষাকৃত বেশি। নিচের দিকে সমুদ্রের ‘ব্যাক ওয়াটার’-এর প্রভাবে জলে লবণাক্ততা বেশি। সেই জল পানের অযোগ্য। প্রখ্যাত ব্যাঘ্র পর্যবেক্ষক কল্যাণ চক্রবর্তী দেখিয়েছেন, অতিরিক্ত লবণাক্ত জলপানের ফলে সুন্দরবনে বাঘের যকৃতে মারাত্মক প্রক্রিয়া হয়। ফলে বাঘ তার বয়ঃবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ মেজাজ হারাতে থাকে। শারীরিক ধৈর্য এবং কৌশল কমে আসে। তখন তারা অপেক্ষাকৃত কম পরিশ্রমে মানুষ শিকার করতে থাকে। সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের বাফার অঞ্চলে সংযত পর্যটন ব্যবস্থা চালু করতে না পারলে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।

বাফার অঞ্চল বাদ দিলে সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের ‘কোর এরিয়া’ হল মাত্র ১২৫৫ বর্গকিমি। এই ‘কোর এরিয়া’র বেশিরভাগ অংশই একেবারে সমুদ্র কিনারে কিংবা নদী মোহনার প্রশস্থতম অংশে অবস্থান করছে। অন্যদিকে সুন্দরবনে এই দ্বীপগুলোর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে খুব একটা উঁচু নয়। ফলে সামুদ্রিক ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতির প্রথম ধাক্কা আছড়ে পড়ে এই ‘কোর এরিয়া’ তে। দ্বিতীয়ত, উত্তরবঙ্গ-আগত নদীগুলোয় জলের প্রবাহ কমে আসছে। জলচাপ কম হওয়ার দরুন সমুদ্রের অনেক আগেই সেগুলো তার ‘ব্যাক ওয়াটার’-এর কাছে আত্মসমর্পণ করছে। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত লবণাক্ততার দরুন ওই ‘কোর এরিয়া’য় ঘাসজঙ্গল কমে আসছে। ফলে সরে যাচ্ছে বাঘের সাধারণ খাদ্য, চিতল হরিণ। তাহলে, এই সমস্যা জজ্জ্বরিত ‘কোর এরিয়া’ বাঘেদের জন্যে কতটা নিরাপদ? একদিকে খাদ্যাভাব, পানযোগ্য জলের অভাব, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত সমুদ্রের রক্তচক্ষু। মনে রাখতে হবে, একটা বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস কিন্তু ‘কোর এরিয়া’র সমস্ত প্রাণীকে নিমেষে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আশু সাবধান! সুন্দরবনের বাঘকে যদি প্রকৃতির বুকে টিকিয়ে রাখতে হয় তাহলে অবিলম্বে ‘বাফার এরিয়া’কে বাঘেদের বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। হ্যাঁ, তাতে করে পার্শ্ববর্তী গ্রামে ‘স্ট্রেইং’-এর সমস্যা হয়ত বাড়বে। মেনে নিতে হবে, অথবা অন্যভাবে তার মোকাবিলা করতে হবে।

এবার আলোচনার মূল পর্বে আসা যাক। কেন গ্রামে বাঘ বারবার? এই নিবন্ধের প্রথমেই আলোচনা করেছি যে বিগত ১১ বছরে সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্প থেকে বাঘ বেরিয়েছে মোট ৮৮ বার। গ্রামে ঢুকেছে ৬৫ বার। এখন প্রশ্ন হল, বাঘেরা কেন বারবার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে? সুন্দরবনে ‘টাইগার স্ট্রেইং’-এর সম্ভাব্য কারণগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হলঃ

১) প্রচলিত যুক্তিহীন অনুমান।
২) প্রচলিত যুক্তিগ্রাহ্য অনুমান।
৩) পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণসাপেক্ষ অনুমান।


১) প্রচলিত যুক্তিহীন অনুমান :

ক) মানুষের গন্ধ শুঁকে গ্রামে ঢোকা :

এই অনুমানের কোন ভিত্তি নেই। যদিও ‘বাঘ’ শব্দের ব্যুৎপত্তগত অর্থ হল ‘প্রবল ঘ্রাণশক্তিযুক্ত জীব’। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার, নানান বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণের পরও বাঘের ঘ্রাণশক্তি আছে কিনা তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। তবে একথা ঠিক যে, বাঘের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলে আপাত দৃষ্টিতে তার ঘ্রাণশক্তি নেই, নাকি আছে, কিন্তু বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তারা ব্যবহার করে না-সন্দেহ সেখানে! কারণ আমাদের চারপাশে সবসময় যে বিড়ালরা ঘুরে বেড়ায়, আপাতদৃষ্টিতে তাদের দেখেও ওই একই সন্দেহ হয়। কিন্তু একটু ভাল করে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ঘ্রাণশক্তি তাদের যথেষ্টই রয়েছে, কিন্তু কুকুরের মত সবসময় তারা তা ব্যবহার করে না। অর্থাৎ, কুকুরের মত বিড়ালদের ঘ্রাণ নেওয়ার ব্যাপারটা মুদ্রাদোষে পরিণত হয়নি। কিংবা বিবর্তনের মাধ্যমে তারা এই অভ্যাস অনেকটাই কাটিয়ে ফেলেছে। বাড়ির পোষা কুকুরকেও অনেক সময় বিনা কারণে সবকিছু শুঁকতে দেখা যায়। বিড়াল কিন্তু অকারণে তা করে না। আমার বাড়ির আশপাশে কয়েকটি বিড়াল ঘোরাফেরা করে। ওদের খুব ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখেছি- যেদিন বাড়িতে মাছ রান্না হয় না, সেদিন ওদের টিকি দেখা যায় না। অথচ যেদিন হল রান্নার গন্ধ দূরে থাক, মাছ ব্যাগ থেকে বের করার আগেই ওরা সপরিবারে হাজির হয়। গন্ধই যদি না পায়- কে ওদের খবর দেয়? সুতরাং এটা প্রমাণিত যে, বিড়ালের ঘ্রাণশক্তি আছে। আর বিড়ালের যদি থাকে, তাহলে বাঘেরও আছে। আছে সিংহ, চিতা, লেপার্ডদেরও। কিন্তু প্রথম গোল বাঁধল জিম করবেটের উক্তিতে। তিনি বললেন, ‘বাঘের কোন ঘ্রাণশক্তি নেই।’ ব্রান্ডার বললেন, ‘আছে, কিন্তু খুবই কম।’ তাঁর পোষা বাঘের বাচ্চাটা নাকি মাটি থেকে মাত্র সাত ফুট ওপরে রাখা মাংসের গন্ধ পেত না। উইলমট সাহেব আর একটু এগিয়ে লিখলেন, ‘বাঘ গন্ধ শুঁকে কোন প্রাণীকে অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু সামান্য উঁচুতে মাচার ওপর বসে থাকা মানুষের গন্ধ পায় না!’ এই প্রসঙ্গে বেগবি সাহেব তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখতে গিয়ে জানান, “সেবার খুব নিচু মাচায় বসেছিলাম। দেখলাম বাঘটা একটা গন্ধ অনুভব করে টা শুঁকতে শুঁকতে চঞ্চল হয়ে চলে গেল। গন্ধের উৎসটা ঠিক ঠাহর করতে পারল না।” স্যানডরসন বললেন, “বটেই তো, বাঘ তো মানুষের গন্ধ পেয়ে সচকিত হতে পারে।” আর্ডলে উইলমট তুলনা টেনে দেখালেন যে উঁচুতে অবস্থানরত কোন মানুষের গন্ধ শুঁকে তাকে খুঁজে না পাওয়ার সমস্যা হরিণেরও আছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, বহুদূরে মাটিতে থাকা মানুষের গন্ধ তারা পায় কি করে? আজ থেকে ১২ বছর আগে, অর্থাৎ ২০০০ সালে এই প্রসঙ্গে কথা হয়েছিল প্রাক্তন বিভাগীয় বনাধিকারিক রামপ্রসাদ দত্তর সঙ্গে। কর্মসুবাদে তিনি প্রায় ১২ বছরসুন্দরবনে ছিলেন। সুতরাং অভিজ্ঞতাও বিস্তর। সেবার বিভাগীয় সচিবকে সুন্দরবনে নিয়ে গিয়ে বাঘ দেখানোর দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপর। তার আগে নাকি ১২ বার সুন্দরবনে গিয়েও বাঘের দেখা পাননি সচিব মশাই। “আনলাকি থারটিন আমার ঘাড়ে’’- দত্ত সাহেব বলেছিলেন। “তাই আগে থেকেই ব্যবস্থা। নেতিধোপানি ওয়াচ টাওয়ারের সামনে জলাশয়ের পাড়ে একটা শুকর বেট দেওয়া হয়েছিল। সেটাকে যখন পুকুর পাড়ে বাঁধা হল, সে যেন একেবারে মরা। সেই যে একপাশ ফিরে শুয়ে পড়ল, ঘন্টার পর ঘন্টা একইভাবে রইল। বহুক্ষণ বাদে একবার পাশ ফিরল বটে, তবে জাস্ট লাইক রকেট। নড়া চরা, ঘাড় তোলা তো দূরের কথা-কানটা পর্যন্ত নড়ছিল না। এভাবে চলল বেশ কয়েক ঘন্টা। অবশেষে বাঘ এল হেলতে দুলতে। দুলকি চালে শূকরটার ফুট পাঁচেকের মধ্যে দিয়ে অবলীলায় চলে এল টাওয়ারের একেবারে নিচে। কী অদ্ভুত ব্যাপার, শূকরটার অস্তিত্বই টের পেল না!”

এই বিষয়ে আরও বিস্ময়কর তথ্য দেন ম্যাকলয়েড। তাঁর অভিজ্ঞতায়, “বাঘ বহুদূর থেকে তার শিকার করা প্রাণীর মাংস খেতে আসে। কিন্তু দেহটাকে একটু দূরে সরিয়ে রাখলেই সে আর তার সন্ধান পায় না।!” এর উত্তরেরতনলাল চৌধুরীর প্রশ্ন, “সত্যিই কি বাঘ সরিয়ে রাখা মৃতদেহের সন্ধান পায় না? নাকি স্বাভাবিক সর্তকতার জন্য, সে সেই দেহাংশ খায় না?” তাঁর যুক্তির স্বপক্ষে মত দিয়েছেন সরোজরাজ চৌধুরি। চৌধুরি তাঁর পোষা বাঘিনী ‘খৈরিকে’ নাকি একাধিকবার মাটি শুঁকে হনুমান এবং গোসাপকে অনুসরণ করতে দেখেছেন। কিন্তু বিজ্ঞান কখনই মনে হওয়া কিংবা সাধারণ চোখে দেখার ওপর নির্ভর করে না। গবেষণা এবং পরীক্ষালব্ধ ফলই একমাত্র সঠিক সত্যটি উদঘাটন করতে পারে। আর এদিকে প্রথম আশার আলো দেখালেন দুই জার্মান বিজ্ঞানী শ্লাইদার এবং লেহাউজেন। তাঁরা দেখান, বিড়াল জাতীয় প্রতিটি প্রাণীই কোন গন্ধ পেলে জিভটা বার করে এরকম ভঙ্গিমা প্রকাশ করে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে ‘ফ্লেমেন’। আবার বিড়াল জাতীয়দের মধ্যে বাঘের এই ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। সুতরাং বাঘ কোন কিছুর গন্ধ পেল কিনা, তার যথার্থ প্রমাণ হল ‘ফ্লেমেন’। বাঘ, সিংহ, হরিণ প্রভৃতি প্রাণীরা প্রত্যেকেই ‘ফ্লেমেন’ করে। এর মাধ্যমে তারা কেবল ঘ্রাণই নেয় না, সেইসঙ্গে কোন গন্ধের উদ্বায়ী অণুগুলিকে শরীরের ভেতর টেনে নিয়ে গিয়ে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের বিশেষ ভূমিকা থাকে। অধিকাংশ জীবের মুখের ভিতরের দিকে এই সূক্ষ্ণ ইন্দ্রিয়টি থাকে। বিজ্ঞানী জ্যাকবসন, এসটেস এবং ভারবার্নের গবেষনাগুলো থেকে এই বিষয়ে বহু অজানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অতএব বর্তমানে এটা প্রমাণিত যে বাঘের ঘ্রাণশক্তি আছে। শিকারের ক্ষেত্রে তা বড় একটা প্রয়োজন না হলেও, কোন সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে বাঘ তার যথার্থ ব্যবহার করে। শিকার ধরার ক্ষেত্রে বাঘ তার চোখ এবং কানের ওপরই বেশি নির্ভর করে। এবার যদি সুন্দরবনের দিকে তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে ২০০৩-০৮ এই ৫ বছরে প্রায় ২০ বারের বেশি বাঘ গ্রামে ঢুকেছে। কিন্তু তাতে করে বাঘের আক্রমণে মারা গেছেন মাত্র ১ জন মানুষ এবং আহত হয়েছেন আরও ১ জন মানুষ। অতএব, মানুষের গন্ধ শুঁকে বাঘ গ্রামে ঢোকে, এই যুক্তি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।

খ) জঙ্গলে খাদ্যভাব :

পরিবর্তিত প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে সুন্দরবনে ‘কোর এরিয়া’র বাঘের খাদ্যাভাব হলেও হতে পারে। এই বিষয়ে আগেই আলোচনা করেছি। কিন্তু তাই বলে, ‘কোর এরিয়া’র বাঘ অতটা পথ পেরিয়ে গ্রামে আসছে খাবারের খোঁজে, এই অনুমান মেনে নেওয়া কঠিন। কারণ একটি নয়, দুটি। এক, এতে করে মারাত্মক ‘ইনফাইটিং’(নিজেদের মধ্যে লড়াই) হবে। হবেই। যতই বলা হোক, সুন্দরবনে বাঘেদের কোন ‘টেরিটরি’ (এলাকা) নেই। এটা হতে পারে না। আমার জমির ওপর দিয়ে পেছনের বাড়ির লোক যাতায়াত করবে-আমি তা মেনে নেব? এই প্রসঙ্গে পরে আসছি। অতএব কোর থেকে কোন বাঘকে গ্রামে আসতে হলে, তাকে তো বাফার পেরিয়েই আসতে হবে!

দুই, তাই যদি হয় তাহলে ‘বাফার’ অঞ্চলে তো খাবারের অভাব হওয়ার নয়! সেখানে এখনও প্রায় ৮/১০ হাজার চিতল হরিণ, হাজার দুয়েক বুনোশূকর এবং অগুন্তি বানর আছে। এইসব শিকার প্রাণীর (প্রে-বেস) বংশ বিস্তারের হার যথেষ্ট বেশি। সুতরাং ৬০-৯০ টি বাঘের খাবারে ঘাটতি পড়ার কথা নয়। অবশ্য, বিবর্তনের ধারায় তারা যদি না তাদের খাদ্য তালিকার পরিবর্তন করতে চায়। এই পরিবর্তন কিন্তু অসমের কাজিরাঙ্গাতে বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে। ইদানিং সেখানে বাঘ- গন্ডার সংঘাত বেড়ে চলেছে। খুব সম্ভবত, এর কারণ হল ওখানে বাঘেদের নিশানা হচ্ছে গন্ডার শাবক। যে কোন বড় প্রাণীর চেয়ে ছোটদের কাবু করা অনেক সহজ। প্রত্যাঘাতের ভয় থাকে না। সুন্দরবনের বাঘও বড় চিতলের চেয়ে ছোট বাচ্চা বেশি ধরে। এইভাবেই জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্র বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়। ‘পেরেন্ট স্টক’(প্রজননক্ষম স্ত্রীপুরুষ) মোটামূটি ঠিকই থাকে। মাংসাশী প্রাণীরা প্রত্যাঘাতের ভয়ে তাদের বড় একটা শিকার করে না। ফলে বংশ বিস্তারে ভাঁটা পড়ে না।

আবার মূল বিষয়ে ফেরা যাক। হরিণ, শূকর ছাড়া সুন্দরবনে বাঘেদের অন্যতম প্রিয় শিকার হল গোসাপ এবং বানর। হ্যাঁ, সুন্দরবনের বাঘ প্রচুর বানর খায়। বেশ কয়েকবার তার প্রমাণ প্রত্যক্ষ করেছি। এই কিছুদিন আগে এক বন্ধু আমাকে প্রশ্ন করলঃ আচ্ছা, বানর তো গাছে থাকে। বাঘ তো আর গাছে ওঠে না। তাহলে বাঘ কীভাবে বাঁদর ধরবে! প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাঘের বুদ্ধি কম নয়। সুন্দরবনের বাঘ মৌচাক ভেঙে মধু খায়। আর সেই মৌচাক ভাভার আগে সারা শরীরে মোটা করে কাদামাটি মেখে রোদে খানিক শুকিয়ে নেয়। এমন অবাক করা ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে শুনেছি। আর বানর ধরা? বাঘের কাছে খুব সহজ। বানর মানুষের মতই রাতে কম দেখে। তাই রাতে দলবদ্ধভাবে কোন একটা গাছে আশ্রয় নেয়। বাঘ অতি সন্তর্পণে একইরকম একটা গাছ বেছে নেয়। এরপর গুটিগুটি পায়ে ঠিক সেই গাছের নিচে গিয়ে এক গগনভেদী হুংকার ছাড়ে। চমকে গিয়ে ঘুমন্ত বাঁদরদের বেশ কয়েকটি ঝপাঝপ নিচে পড়ে যায়। তাদেরই দু-একটাকে থাবা বসিয়ে দেয় বাঘ। অতএব, সুন্দরবনের বাফারে খাবারের এত প্রতুলতাথাকা সত্ত্বেও, কেবলমাত্র খাবারের জন্য বাঘ গ্রামে ঢুকতে যাবে কেন? বোধগম্য হয় না!

গ) প্রসবজনিত কারণ :

বহু বছর ধরে এই প্রচলিত অনুমান চলে আসছে। এটা ঠিক যে বেশ কিছু স্তন্যপ্যায়ী জীবের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে পুরুষ প্রাণীটি তার শাবকদের বড় একটা পছন্দ করে না। অনেক ক্ষেত্রে মেরেও ফেলে। স্ত্রী প্রাণীদের ক্ষেত্রে কদাচিত এই আচরণ দেখা যায়। ব্যাতিক্রম সরীসৃপ এবং উভচর। কিছু কিছু পুরুষ বাঘের ক্ষেত্রেও এই একই স্বভাব দেখা যায়। কিন্তু সব পুরুষ প্রাণী মোটেই তা করে না। বাঘ বা বিড়াল জাতীয় প্রাণীদের এই স্বভাব লক্ষ্য করেই উক্ত ধারণার জন্ম। স্বাভাবিক কারণে প্রসবের আগে বাঘিনী খানিকটা নিরুপদ্রব জায়গা খোঁজে। এই স্বভাব কুকুর জাতীয় প্রাণীদেরও আছে। তবে এই ধারণা মোটেই ঠিক নয় যে, কেবলমাত্র পুরুষ সঙ্গঈর ভয়েই স্ত্রী প্রাণীরা নিরাপদ জায়গা খোঁজে। অন্যান্য শিকারি প্রাণীদের নজর এড়াতে আসন্ন প্রসবা স্ত্রী-প্রাণী ওই সতর্কতা নেয়। এখন প্রশ্ন হল, তাই যদি হয় তাহলে সুন্দরবমের বাঘ বন ছেড়ে লোকালয়ে আসতে যাবে কেন? যে প্রাণীটি গভীর জঙ্গল ছেড়ে বাফারে সচরাচর আসতে চায় না, সে কিনা সান্তান প্রসবের জন্য লোকালয়ে যাবে! আর তাই যদি হয়, তাহলে সুন্দরবনে আজ পর্যন্ত যতগুলো বাঘ লোকালয়ে ঢুকেছে এবং ফাঁদে ধরা পড়েছে তার কতগুলো গর্ভবতী ছিল? যদিও, এই প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া ভার!

২) প্রচলিত যুক্তিগ্রাহ্য অনুমান :

বয়ঃবৃদ্ধি এবং আঘাত প্রাপ্তিঃ :

এই অনুমানের যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য ভিত্তি আছে। কারণ আমরা জানি, সুন্দরবনে শ্বাসমূলের উপস্থিতির জন্য খুড়হীম প্রাণীরা যথেষ্ট আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এই শ্বাসমূলজনিত কারণে অধিকাংশ বাঘের থাবাতে ক্ষত তৈরি হয়। সামান্য ক্ষত হলে, তা হয়ত কিছুদিনের মধ্যেই লালা-রস চিকিৎসার মাধ্যমে তারা নিজেরাই সারিয়ে ফেলে। কিন্তু বাঘের দৈহিক ওজনের জন্য বেশিরভাগ ক্ষতই হয় বেশি গভীর। তা সারে তো নাই, ক্রমে তাতে পচন ধরতে শুরু করে। ফলে সে তখন আর বেশি হাঁটাচলা করতে পারে না। শিকারে অপারগ হয়ে পড়ে। এই শ্রেণীর বাঘেরা আর জঙ্গলে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে শিকার ধরার ঝুঁকি নেয় না। বরং অন্ধকারে শিকারের খোঁজে নদীর ধারে ঘাপটি মেরে থাকে। তাতেও শিকার না মিললে অগত্যা সাঁতরে অন্য পাড়ে যায়।

অন্যদিকে সুন্দরবনের অনেক গ্রাম একেবারে বনের ধারে। মাঝে কেবল স্বল্প প্রশস্ত নদী বা খাঁড়ি। প্রতিটি গ্রামে বেশ কিছু গবাদি পশু থাকে। যারা গৃহপালিত নয়। ধর্মীয় কারণে উৎসর্গীকৃত। কোন গ্রামেই এই ধরণের গবাদি পশুদের জন্য আস্তানা থাকে না। এইসব গবাদি পশুরা রাতের অন্ধকারে চড়তে চড়তে নদীর পাড়ে চলে আসে। নদীর অন্য পাড় থেকে তাকে নিশানা করতে থাকে বাঘ। তারপর সন্তর্পণে নদী সাঁতরে সোজা শিকারের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই ভাবেই ক্রমে এরা সহজ শিকার ধরার পন্থায় অভ্যস্থ হয়ে ওঠে এবং মাঝে মধ্যেই গ্রামে হানা দিতে থাকে। আর তখনই বিপদ। সামনে মানুষ পড়লে তাকেও আক্রমণ করে বসে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ দেখে ভয় পেয়ে যেখানে পারে সেখানেই ঢুকে ভয় পেয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। বিশেষ করে গোয়াল ঘর কিংবা রান্নাঘরে। এখানে আরও একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। কেবলমাত্র পায়ের ক্ষতই নয়, সুন্দরবনের অধিকাংশ বাঘের শিকার দাঁতে (ক্যানাইন) ক্ষত থাকে। ছোট শিকারের অভাবে বড় প্রাণী ধরতে গিয়ে এই বিপত্তি ঘটে। কারণ, সেই শিকারও যথেষ্ট বলশালী। সে বাঁচার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এতে করে বাঘের দাঁত যায় ভাঙে। পরবর্তী সময়ে ওই খুনে দাঁতের অভাবে বাঘের শিকার ধরার স্বাভাবিক ক্ষমতা লোপ পায়। সিংহদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা অনেক কম। কারণ তারা দলবদ্ধভাবে শিকার ধরে। বাঘেদের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয় না। কারণ, এরা একক শিকারি।

৩) প্রমাণযোগ্য অনুমান :

ক) অ্যাডভেঞ্চার :

বহু বছর ধরে বন্যপ্রাণীদের খুব কাছ থেকে দেখার পর, কেন জানি না মনে হয়, সমস্ত জীবেরই আচরণগত ভিত্তিগুলো মোটামুটি এক। তা সে হাতি, মানুষ কিংবা পিঁপড়ে, যাই হোক না কেন। এই উপলবদ্ধির কথা যেখানেই বলেছি, হাসির খোরাক হয়েছি। এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি কোনদিন পাহাড়ে গেছ?” “হ্যাঁ গেছি।” “কেন গেছ?” সে বলেছিল, “ভাল লাগে তাই!” “কেন ভাল লাগে?” এবার বন্ধু একটু ইতস্তত করে বলল, “জানি না।” আমি বললাম, “এ্যাডভেঞ্চার” সে তখন একগাল হেসে বলল, “ঠিক তাই।” তখন আমি তাকে বোঝালাম, “তাহলে দেখো, অ্যাডভেঞ্চার যদি তোমার ভাল লাগে, তাহলে বাঘেদের ভাল লাগতে অসুবিধা কোথায়? তবে হ্যাঁ, তুমি নিশ্চয়ই বৃদ্ধ বয়সে অ্যাডভেঞ্চার করতে যাবে না। বাঘেদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। সুন্দরবনের বেশ কিছু যুবা বাঘ নেহাতই কৌতুহলের বশে ‘স্ট্রে-আউট’ করে। কখনও গোসাবা, কখনও সামসেরপুর, কুলতলি, জেমসপুর, পাখিরালয়, রজত জুবিলি, পীরখালি, বালি, দয়াপুর, মিত্রবাড়ি, লখিমপুর, গ্লাসখালি, সোনাগাঁ, হেঁতালবাড়ি, সাতজেলিয়া, কালিতলা, আমলামাটি, হেমনগর, সত্যনারায়ণপুর, কালিদাসপুর, কুমিরমারি প্রভৃতি গ্রামে।তবে হ্যাঁ, ‘স্ট্রে-আউট’ সব বাঘই কিন্তু অ্যাডভেঞ্চার করে না। শতকরা কিছু সংখ্যক বাঘকে এর আওতায় আনা যেতে পারে। এবার বন্ধু স্বীকার করল, “তা কিন্তু হতে পারে।” আমি বললাম, “পরীক্ষা প্রার্থনঈয়।”

খ) কুয়াশা :

বাঘের ‘স্ট্রেইং’ এর সঙ্গে কুয়াশার যে কোন সম্পর্ক থাকতে পারে, তা আমি কেন, পৃথিবীর তাবৎ বিজ্ঞানীরাও কখনও ভেবেছেন বলে শুনিনি। অথচ দেখা যায় সুন্দরবনে সারা বছর যত ‘স্ট্রেইং’ হয়, তার প্রায় ৪০/৫০ শতাংশ হয় নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে, অর্থাৎ শীতকালে। এই সময়, ঘন কুয়াশা নদী আর জঙ্গলকে মিলিয়ে দেয়। কোনভাবে বোঝার উপায় থাকে না যে, কোনটা জল আর কোনটা স্থল। এই সময় যারা সুন্দরবনে চলাচল করেন, তারা জানবেন, দূর থেকে সব দ্বীপগুলোকে প্রায় একইরকম দেখতে লাগে। সব দ্বীপের ধারে অসংখ্য গাছ-গাছালি আছে। তা সে অরণ্য দ্বীপ বা গ্রাম্য দ্বীপ যাই হোক না কেন। দূর থেকে তো অনুধাবন করা অসম্ভব। রাত হলে তো কথাই নেই। বাঘের চোখে ‘টেপটাম লুসিডাম’-এর উপস্থিতি থাকায় রাতের অন্ধকারে তারা দিনের চেয়েও রাতে ভাল দেখে। কিন্তু কুয়াশার মধ্যে তাদের এই শক্তি কোন কাজ করে না। ফলত, এইসময় খুব সম্ভবত বেশ কিছু বাঘ পথ ভুলেই গ্রাম্য-দ্বীপ উঠে পড়ে।

এখানে আরেকটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাঘেদের এলাকা। বলা হয়, প্রতিটি বাঘ বা বাঘিনী তাদের দেহ নিঃসৃত ‘মার্কিং ফ্লুইড’- এর সাহায্যে তার এলাকা নির্দিষ্ট করে। বাঘিনী মোটামুটি তার এক-তৃতীয়াংশ। তাই যদি হত, তাহলে কেঁদোতে ছেড়ে আসা বাঘ কি করে গ্রামে ফিরবে? এর স্বপক্ষে একটা যুক্তি খাড়া করা হয়। সুন্দরবনে নাকি বাঘেদের কোন এলাকা নেই। আবার এটাও শোনা যায়, একটা বাঘের এলাকার মধ্যে নাকি তিনটি বাঘিনী থাকে। প্রত্যেকে পৃথকভাবে। কেবল মিলনকালে বাঘ ঋতুমতী বাঘিনীর সঙ্গে কয়েকদিন কাটিয়ে যায়। তবে কখনই দুটি বাঘিনী একসঙ্গে তাদের পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে থাকে না। ব্যতিক্রম মা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শাবক।

এইসব তাত্ত্বিক দিক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বলতে হয়, বাঘ, গরু, ছাগল সকলেরই নির্দিষ্ট ‘এলাকা’ আছে। আবার নেইও। এটা সম্পূর্ণ তার পারিপার্শ্বিকতার ওপর নির্ভর করে। যেমন নিরুপোদ্রব বিশ্রামের জায়গা, পর্যাপ্ত খাবার এবং উপযুক্ত সঙ্গী বা সঙ্গিনী। নিজেদের (মানুষ) প্রশ্ন করলেই এই প্রাকৃতিক সত্যের উত্তর পাওয়া যায়।জীবনের ঊক্ত শর্তগুলোয় ভাঁটা পড়লে সমস্ত ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। এই ভারতেই, মন্বন্তর বা খাদ্যাভাবের সময়, দূর থেকে কাতারে কাতারে মানুষ শহরে চলে আসত-ভাতের ফ্যানের খোঁজে। দুর্গত মানুষ সামান্য চিঁড়ে-গুড়ের জন্যে আকাশে ওড়া কপ্টারের পিছনে দৌড়তে থাকে। পুকুরে পড়ল না কি পাতকুয়োয়, তা খেয়াল করে না। এ তো গেল খাবারের দিক। বাসস্থান না পেলে মানুষ দখলদারি চালায়। তখন তাদের ছাউনি দিয়ে শান্ত করতে হয় সরকারকে। উদ্বাস্তুরা মাথার ছাউনি খোঁজে। রাতের অন্ধকারে পাঁচিল টপকে ধর্ষক বাড়িতে প্রবেশ করে- তার তথাকথিত উন্নত মানুষের কথা! জন্তুরা তো অনুন্নত, বর্বর, হিংস্র। আসলে জীবনের নুন্যতম চাহিদাগুলো সকলেরই এক। বলতে পারেন, বিধির বিধান। বাঘ ব্যাতিক্রম হবে কি করে? নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের সন্ধানে, শিকারের সন্ধানে কিংবা সঙ্গী অথবা সঙ্গিনীর সন্ধানে এদিক-ওদিক করবেই। তখন দুটি বাঘের মধ্যে সংঘাত হবে। যদিও বছরের অন্যান্য সময়ে এরা যতটা সম্ভব একে অপরকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। কিন্তু শীতকালে কী করবে? কুয়াশায় কিছুই দেখা যায় না ভাল। তাই এইসময় নিজেদের মধ্যে সংঘাত যায় বেড়ে। পরাজিত বাঘ উদভ্রান্তের মত পালাতে থাকে। ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে। তারপর সাঁতরে ওঠে নদীর কূলে। কিন্তু এ কোন কূল? বুঝে ওঠার আগেই শত শত মানুষ, হুলাপার্টি, জাল, বন্দুক কিংবা গণপিটুনি। পুনরুদ্ধার করা গেলে তো ভাল। নয়তো ভবলীলা সাঙ্গ।

এখানে এত বিস্তারিত আলোচনার কারণ হল, আমার মতে শীতকালে বাঘেদের ‘ইনফাইটিং’ এবং ‘স্ট্রেইং’-এর অন্যতম খলনায়ক হল কুয়াশা। বছরের অন্য সময় আলাদা আলাদা কারণ নিশ্চই আছে। যা আগেই আলোচনা করেছি।

যাইহোক সুন্দরবনে ‘টাইগার স্ট্রেইং’-এর এই নতুন কারণটি (কুয়াশা) প্রথম আমারই নজরে আসে এবং আচমকা। অতঃপর, আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর থেকে নির্দিষ্ট দিনগুলোর (বিগত ৩ বছরের শীতকালে যে দিনগুলোতে গ্রামে বাঘ ঢুকেছে) ক্যানিং স্টেশনের কুয়াশা-তথ্য জোগাড় করি। যা কিনা আবহাওয়া দপ্তরের সুন্দরবনের সবচেয়ে কাছের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। আমার অনুমান মিলে যায়। অবাক হয়ে দেখলাম, উক্ত সময়কালে(তিন বছর) যে যে দিনগুলোতে বাঘ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পড়েছে কিংবা গ্রামে ঢুকেছে, তার মধ্যে ৮২ শতাংশই দিনেই ওই অঞ্চলে কুয়াশার ঘনত্ব ছিল অন্যান্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি। এরপর বাড়ির পোষা বিড়ালের উপর পর্যবেক্ষণ চালিয়েও একই সত্যে পৌঁছোই। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত কাজ শুরু করেছিলাম। দুর্ভাগ্য, এহেন একটি স্বতন্ত্র গবেষণাকে আটকে দিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মুখ্য বনপাল (বন্যপ্রাণী)সিতাংশু মন্ডল এবং সুন্দরবন জীবপরিমন্ডলের তৎকালীন পরিচালক নবীন চন্দ্র বহুগুণা। একটি চিঠি দিয়ে আমার সমস্ত তথ্য একটি বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওইয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। সে যাইহোক, একটা সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী নিবন্ধের মাঝে এইসব ন্যক্করজনক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই না।

পরিশেষে, সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামবাসীদের মুখ চেয়ে এইটুকুই বলব যে, সেখানে গ্রামে বাঘ ঢোকার সমস্যা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। এরই সঙ্গে টিকিয়ে রাখতে হবে প্রকৃতির এই অনন্য সুন্দর জীবটিকে। দায়িত্ব নিয়েই বলছি-কাজটি অসম্ভব নয়।