Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

ভুটান পাহাড়ের কোলে
শুন্ডি নয়, বিন্দু চলো

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান, জলপাইগুড়িঃ শিলিগুড়ি থেকে লাটাগুড়ি যাচ্ছিলাম। গন্তব্য ছিল গরুমারা জাতীয় উদ্যান। রাস্তায় পড়ল চালসা মোড়। সেখান থেকে অভয়ারণ্যের মূল ফাটকের দূরত্ব মাত্র ১৭ কিলোমিটার।শুনলাম গাড়ি আর এগোবে না ওখানে অবরোধ চলছে। কি করি! রাস্তার বাঁদিকে ছোট-খাটো কয়েকটা খাবারের দোকান। সেখানে লাঞ্চ সারলাম। নেপালি ড্রাইভার পরামর্শ দিল; বসে থেকে কি করবেন? চলুন ‘বিন্দু’ ঘুরে আসি। রওনা হলাম বিন্দু’র উদ্দেশ্যে।

গাড়ি চলতে লাগল। এবড়ো-খেবড়ো পথ। দু-পাশে শাল জঙ্গল! তার সঙ্গে সেগুন, শিরীষ, গামার-এর সহাবস্থান আছে। চাপড়ামারি অভয়ারণ্যকে বাঁ-হাতে রেখে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি। দু-পাশে ঘন জঙ্গল। সামনে পড়ল একটা ফৌজি ব্যারাক। বালির বস্তার পেছন থেকে মেশিনগান হাতে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে প্রহরী। হয়তো টুরিস্ট ভাবল, তাই আটকাল না। আর একটু সোজা যাবার পর ডানদিকে, বাঁ-দিকে পাক খেতে লাগল রাস্তাটা। এবার পাহাড়ে উঠছি। ভূ-পৃষ্ট থেকে উচ্চতা বাড়ছে। ডানদিক বেশ নিচু হয়ে গেল। রাস্তার কোন অংশ বেশ খাড়াই। বুঝতে পারছিলাম, গাড়িটার উঠতে কষ্ট হচ্ছে। গাড়ি হলে কি হবে, যন্ত্র তো! পাইলট ডাউন গিয়ার দিয়ে দিয়ে গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এযেন কোন এক অবুঝকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কাজ করানোর মত ব্যাপার! বাঁদিকে খাড়াই পাহাড় ঘষা মাজা। খাঁজে খাঁজে আগাছা জন্মেছে। থরে-থরে সাজানো বোল্ডারগুলো গিলে খেতে আসছিল। ভয় হচ্ছিল, যদি একটা খসে পড়ে! কাগজে এমন কত খবরই তো বেরোয়, ধস্ নামার। যাইহোক, ভাগ্যটা ততটা অপ্রসন্ন ছিল না। তেমন কিছু ঘটেনি। বাঁ দিকে পাহাড়ের কোল বেয়ে নেমে আসছে একটা ছোট্ট ঝোড়া। রাস্তাটা ক্রশ করে খাদে নেমে যাচ্ছে জলরাশি। বুঝলাম, জঙ্গল ছাড়া এ এক অপরিচিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা। শহরে বাড়ি-গাড়ি থেকে বহু যোজন দূরে এ এক প্রাকৃতিক সভ্যতা। অসংখ্য বৃক্ষরাজি দাঁড়িয়ে আছে পরস্পর। কোন বিরোধ নেই। শান্ত, নিঝুম পরিবেশ। শব্দ কেবল গাড়ির। ওহ্! ভুল বললাম। তার সঙ্গে ঝিঁঝিঁর শব্দ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। একবার দেখেছি। ছোট্ট কালচে পোকা। অতটুকু আকৃতি, সামনে ডানা দুটো পিঠের ওপর তুলে ঘষতে থাকে। তাতেই বিকট শব্দের উৎপত্তি হয়! অনেকে বলেন, ঝিঁঝিঁর ডাক। কথাটা ভুল। কি জানি, সৃষ্টিকর্তা কি দিয়ে যে ওদের ডানাদুটো বানিয়েছেন! বলিহারি তাঁর ক্ষমতা!

দেখতে দেখতে বেশ অনেকটা উঠে গেছি। ডানদিকে, নিচের নদীটাকে গরুর দড়ার মত সরু লাগছিল। আশপাশে ঘন সবুজ বনানি। যেন ‘স্যাটেলাইট ইমেজ’ দেখছি! বাঁদিকে ঝোড়া। আবার ঝোড়া। খানিকটা এগোলাম। ওরে বাবা, এ-তো ঝোড়ার লাইন! বাঁ দিকে দেখলাম-বেশ সুসজ্জিত ‘প্ল্যানটেশন’। ইঞ্চি কয়েক ব্যাসার্ধের গাছগুলো পরস্পর কেমন একই দিকে হেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কি গাছ এগুলো? ‘রবার’। ড্রাইভার বলল। তাই বুঝি? দাঁড়াও দাঁড়াও, দেখি। এ গাছ তো ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ওসব দিকে প্রচুর হয় শুনেছি। আর আমাদের এখানে ত্রিপুরায়। আচ্ছা বুঝেছি, পাশেই বনদপ্তর বোর্ড। তার মানে, রাজ্য বনদপ্তর এখানে পরীক্ষামূলকভাবে এখানে ‘রবার প্ল্যান্টেশন’ করেছে। মাটি থেকে ফুট দু-আড়াই ওপরে সব গাছে প্লাস্টিক বাঁধা রয়েছে। তার নিচে হুকের মত কি একটা দিয়ে লাগান আছে অর্ধেক নারকেল মালা। সবগুলোই ভর্তি। সাদা সাদা জমা নারকেল তেলের মত বৃক্ষ নির্যাস। ওরা বলল, এটাই নাকি আমাদের বহু ব্যবহৃত রবারের কাঁচামাল বা ‘ল্যাটেক্স’। শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি। মোবাইল জি.পি.এস-এ দেখলাম। সামনে মেঘে ঢাকা ভুটান পাহাড়। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে জলঢাকা নদী, মাঝে অসংখ্য সবুজের ঢাল। একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। ছোট-ছোট নিচু বারিগুলো রাস্তার দু-পাশ ঘেঁষে হাট বসিয়েছে। হাঁড়ি-কড়া-রান্না। ঘরের চালে লেপ-কম্বল শুকোচ্ছে। হ্যাঁ, এই দৃশ্যতো শহরেও দেখা যায়। যেখানে মানুষ থাকে, সেখানে এমনটাই হয়। মনে হল প্রকৃতির রাজ্য থেকে আবার মানুষের রাজ্যে ঢুকে পড়েছে।তবে এক্ষুনি ছাড়িয়ে যাব। গ্রামটাই বড়ই ছোট। এটাই ‘ঝালং’। বন উন্নয়ন নিগমের একটা বাংলো আছে। সুসজ্জিত। আপনারাও এসে থাকতে পারেন। যোগাযোগের ঠিকানা পরে দিয়ে দিচ্ছি। ঝালং ছাড়িয়ে আরও ওপরে উঠেছি। কানের পর্দাটা বেশ কটকট্ করছে। ভূ-পৃষ্ট থেকে প্রায় ৬০০ মিটার ওপরে চলে এসেছি। অ্যাডভেঞ্চার ভালই জমছে। আবার মনে মনে ভয়ও হচ্ছে, কি জানি-ঠিকানাটা পার্মানেন্টলি বদলে যাবে না ত! সে যাইহোক, প্রকৃতির রূপ-রস গন্ধ, আস্বাদন করার এমন সুযোগ সচরাচর ঘটেনা। তাই সুযোগ ছাড়া নেই। প্রান খুলে প্রকৃতিকে দেখো আর উপভোগ করো। একবার বা দিক দেখি তো পরমুহূর্তে ডানদিক। রাস্তার দু’পাশ ভারি সুন্দর। বাঁদিকে ঝুলে এসেছে পাথরের চাঁই। ছোট-বড়-মাঝারি-ক্ষুদ্র বিভিন্ন মাপের পাথরের সহাবস্থান। যেন থার্মোকলের চালচিত্র। রাস্তা বাক নেয়, পাহাড়ও। ভুল বললাম। আসলে পাহার যায় না। রাস্তাটাই তো পাহাড় কেটে কেটে এগিয়ে গেছে। আর ডানদিক বরাবর বয়ে চোলেছে জলঢাকা নদী। অসংখ্য ঝোরা থেকে জলধারা নেমে এসে মিশেছে সেই নদীতে। নদীর যাত্রা পথ বরাবর ছোড়িয়ে রয়েছে বোল্ডার। খরস্রোতা নদীর জলস্রোত গিয়ে মারছে পাথরে। সাদা ফেনায় ভরে যাচ্ছে। আবার ধাক্কা, আবার ফেনা। পাগোলের মত নানান অদেখা দৃশ্য উপভগ করতে করতে পৌঁছে গেলাম বিন্দু। এটাই নাকি ভূটান সিমান্ত। জলঢাকার এ-পার হচ্ছে ভারত, ও-পার ভূটান। সরু নদীর ওপারে খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ চাদরে মোড়া ভূটান হিমালয়। পাহাড়ের মাথায়ে কিছু মানুষকে চলা ফেরা করতে দেখছিলাম। ড্রাইভার বলল; ওরা ভুতানের সীমান্তরক্ষী। আর ভারতের? হ্যাঁ তারাও রয়েছে। আর একটু এগোতে সেনা লাম। ছাউনি। একটা ফউজি গাড়িও দেখলাম। যার সামনে জনা পঞ্চাশেক ভারতীও সীমান্তরক্ষী দাঁড়িয়ে শপথ নিচ্ছিল। আবার ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম, কি ব্যাপার? ও বলল, একমাস অন্তর ‘ডউটি চেঞ্জ’ হয়। একটা নতুন দল এসেছে। দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছে। একদল সুঠাম চেহারার তরতাজা যুবক। মূলস্রোত সভ্যতার হাসি-আনন্দ-উল্লাস ছেড়ে নির্জন প্রান্তে রাতের পর রাত আমাদের নিরাপত্তা দিয়ে চলেছে। মোবাইলে পরিবারের সঙ্গে কাথ বলার সুযোগটুকুও নেই। ওরা থাকে কি করে এখানে?কাজই বা কি? না, ওদের কোন কাজ নেই? সেনাবাহিনীর কঠোর অনুশাসন অনুযায়ী সারাদিন নিয়ম মেনে শরীরচর্চা, আর বসে বসে নদীর ঢেউ গোনা। এটাই ওদের রোজনামচা। একেই বলে চাকরি।

যাইহোক, সামনে পৌঁছে দেখতে পেলাম বিশাল জলঢাকা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। দাঁড়িয়ে আছে নদীর বুক চিরে। কয়েকটি কপাট খোলা, বাদবাকি বন্ধ। বিপুল জলরাশি এসে সজোরে আছড়ে পড়ছে ওগুলোর ওপর। ছিটকে উঠছে সাদা ফেনার পাহাড়। ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের এটি নাকি অতি প্রাচীন একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। যা উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিদ্যুতের যোগান দিয়ে থাকে। সামনেই রয়েছে একটা ‘টি-স্টল’ মোমো পাওয়া যায় এখানে। নেপালি মেয়েটা ভীষণ প্রাঞ্জল, কর্মঠ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বন্ধুত্ব জমিয়ে ফেলল। খুব সরল প্রশ্ন করে ওরা। কলকাতা থেকে এসেছি শুনেই জানতে চাইল; আচ্ছা কলকাতায় কত মানুষ থাকে? রোজই তো আসে দেখি! মনে মনে হাসলাম। ভাবলাম, গড়ে হয়ত দিনে দু’জন পর্যটক বিন্দুতে আসেন। তাতেই ও ভাবছে কলকাতায় কত মানুষ থাকে! না, কলকাতার পপুলেশন রিপোর্ট-টা ওকে বলিনি। অত বড় অঙ্ক আর এতগুলো শূন্য ও হিসাব করতে পারবে না। ওর দেখা গ্রাম বা শহর হল, ঝালং এবং গদাখ গ্রামের দুরত্ব বন্দু থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার। ওখানে একটা মন্দীর আছে। ওরা বলে দেবীস্থান। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসছে ছোট্ট নদী। সেটা নাকি বছরের কোন সময়ই শুকোয়ে না। স্থানীয় মানুষের ধারণা, দেবীর আশীর্বাদেই নাকি এমনটাই হয়!আসলে মানুষ যেখানে যুক্তি খুঁজে পায়ে না, তাই তো ঈশ্বরের ওপর ছেড়ে দেয়। সেই কারণেই বোধয় হিমালয়ের শৃঙ্গ থেকে ভারত মহাসাগারের কোল পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে অসংখ্য দেবদেবীর মন্দির। নানা বিশ্বাস, নানা মত, নানান সংস্কার। তার থেকেই জণ্ম নিয়েছে বিবিধ আচার অনুষ্ঠান, রীতিনীতি। যার বেশিরভাগই আঞ্চলিক। তাই বোধ হয় কবি বলেছেন, “নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান-বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান”। এই সবই হল মনুষ্য সমাজের ব্যাপার। বিন্দুতে এসেও তা পরখ করলাম!

কিন্তু প্রকৃতি? তার রুপ-রস-গন্ধ অভিন্ন। কিন্তু, বৈচিত্র্য ভিন্ন। যাকে আমরা বলি জৈববৈচিত্র্য। বিন্দু পৌঁছে তা আরও একবার পরখ করলাম। ভূটান আর ভারত-দুটি পাহাড়ই দাঁড়িয়ে আছে। আপাদমস্তক সবুজ চাদরে মোড়া। ওদের পোশাক এক।পৃথক করে রেখেছে মাঝখানে বয়ে চলা জলঢাকা নদী। জলের শোঁ-শোঁ শব্দ আর ঝিঁঝিঁর শব্দ। দু’য়ে মিলে এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল। যেন বলছিল, “চোপ রাও, প্রকৃতির চাকা ঘুরছে।” ঘড়ির কাঁটার মত নির্দিষ্ট তার গতি। নির্দিষ্ট ছন্দ। সেই মহা জাগতিক ছন্দ ব্যাঘাত ঘটলে প্রলয় হবে। ধ্বংস হবে ব্রহ্মান্ড। নিমেষে ধূলিসাৎ করে দেবে আমাদের গর্বের সভ্যতা। আফসোস হচ্ছিল, ইস্, দুই পাহাড়ের জৈববৈচিত্র্যের পার্থক্যগুলো যদি বার করে ফেলতে পারতাম! উপায় নেই। যোগ্যতা নেই। শ্রদ্ধা রইল তাঁদের প্রতি, যাঁরা অবলীলায় এই কঠিন কাজ করে ফেলতে পারে। বিন্দু-তোমাকে সেলাম!