Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

দ্রুত কমছে সোনালি শিয়াল
সাঁঝের গ্রামে হুক্-কা-হুয়া আর শুনি না

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান, কলকাতাঃ সোনালি শিয়াল একটি বংশীয় প্রজাতি। বৈঞ্জানিক নামঃ কেনিস অউরিয়াস, ফ্যামিলিঃ ক্যানিদি, জেনাসঃ ক্যানিনি, অর্ডারঃ কারনিভোরা। ভারতে এদের ৩টি উপ-প্রজাতি দেখা যায়। যথা: (১)অউরিয়াস(২)ইন্ডিকাস (৩)নারিয়া।

আমি তখন অনেক ছোট। হয়ত ক্লাস ৫/৬-এ পড়ি। প্রতি সপ্তাহের শেশেই আমরা দেশের বাড়িতে যেতাম। নদীয়া জেলার শান্তিপুর। আমার জন্ম কলকাতায়, থাকতামও কলকাতায়। কিন্তু কেন জানি না, শহর আমার একদম ভাল লাগেত না। আজও লাগে না। সারা সপ্তাহ মন খারাপ করে বসে থাকতাম, কবে শুক্রবার আসবে। শান্তিপুর যাব। ওখানে আমার এক কাকা ছিল। আমার চেয়ে ৫/৭ বছরের বড়। কিন্তু আমাদের মধ্যে অসম্ভব বন্ধুত্ব ছিল। কারণ আমরা দুজনেই জীবজন্তু ভালবাসতাম। সারাদিন মাঠে-ঘাটে ঘুরে নানান প্রজাতির পাখি, জীবজন্তুর ছানা ধরে আনতাম। তাদের লালন-পালন করা হত। চলত পর্যবেক্ষণ। বাঘরোল, ভাম, বেজি, সজারু, ভোঁদর, গো-সাপ, বাঁদর, হনুমান, কাঠবিড়ালি, ঊদবিড়াল, বনবিড়াল, মেছো বিড়াল, -কী না পুষেছি! পাখির কথা তো ছেড়েই দিলাম। বোধহয়, হাজার পাঁচেক, কী আরও বেশি হবে। সেবার কী কারণে যেন বাবার কলেজ ছুটি ছিল। বেশ কিছুদিন টানা ছিলাম। আমার আর ছোটকার তো পোয়াবারো। আমরা ঠিক করলাম শিয়াল ধরব। কিন্তু শেয়ালের গর্ত ভেবে হাট ঢুকিয়ে ছোটকা ইঁদুরের কামড় খেল। বাড়িতে বলা হল, বাবলা গাছের কাঁটা ফুটেছে। চুন লাগিয়ে চিকিৎসা চলল। সেসব নানান পাগলামি। যাইহোক অবশেষে শিয়াল মিলল। গর্তের মধ্যে একদম প্রমাণ মাপের তিনটি শাবক। মা-শিয়াল তখন ছিল না। বোধহয় খাবারের সন্ধানে গিয়েছিল অথবা আশেপাশে কোথাও ঘাপটি মেরে সব দেখছিল। যাইহোক, ধরতে গিয়ে দুটি বাচ্চা ফসকে পালাল। একটিকে আমি পাকড়াও করলাম। বাড়ি নিয়ে এলাম। বড়দের বকাবকি, শাসানির পালা শুরু হল। অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে তাদের ঠাণ্ডা করা হল। এবার শিয়াল ছানাকে খাওয়ানোর পালা। প্রথমে দুধ, তারপর একে একে ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ, অবশেষে মুরগির মাংস, সবই দেওয়া হল। সে ব্যাটা কিছুই মুখে তোলে না। এমনকি জল পর্যন্ত না! মহা মুশকিলে পড়া গেল। ওর সঙ্গে আমাদেরও খাওয়া দাওয়া শিকেয় উঠেছে। কারণ, বড়ঠাকমা বলে রেখেছেন, বাড়িতে শিয়াল মরা অমঙ্গল। জ্যাঠামশাই শাসিয়েছেন, শিয়াল যদি মরেছে তোদের দুটোকে ছাল ছাড়িয়ে কুকুরকে খাইয়ে দেব! দেখতে সন্ধে গড়িয়ে রাত হল। ঘরের এক কোণে খাঁচায় ওটাকে রাখা ছিল। তখন ও ওখানে ইলেকট্রিসিটি পৌঁছয়নি। বারবার কুপি নিয়ে দেখছি, কিছু খেল কিনা। উঁহু! ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ছিল। আমাদের রক্তচাপ বাড়ছে। মরে গেলে কেবল জ্যাঠামশাইয়ের নয়, বিশাল যৌথ পরিবারের গণপিটুনি হবে। দুজনে এইসব সাতপাঁচ ভাবছি। দেখতে দেখতে রাত প্রায় ১২টা। আমাদের বাড়ির আশপাশে কয়েকটি শিয়ালের ডাক কানে এল। গুরুত্ব দিইনি। ভাবছিলাম এলাকার শিয়াল। ওরা তো রোজই ডাকে। এই বাচ্চা তো অনেক দূরের। কিন্তু না। আমাদের ভাবনায় ভুল ছিল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিয়ালের সংখ্যাও বাড়তে থাকল। আস্তে আস্তে আমাদের বাড়িটা সম্পূর্ন ঘিরে ফেলল প্রায় দুশো শিয়াল। তাদের সম্মিলিত চিৎকারে সারা পাড়ার ঘুম মাথায়। সত্যি সত্যিই আমরা তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এ কি ঘটল রে বাবা! এই ভাবে বেশ কিছুক্ষ্ণণ চলার পর জ্যাঠামশাই উঠে এলেন। থমথমে মুখ। আমাদের কিছু বললেন না। সোজা চলে গেলেন খাঁচার কাছে। বাচ্চাটাকে ঘেঁটি ধরে বের করে আনলেন। আমাকে জানলা খুলতে বললেন। তারপর হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে ছুঁড়ে বিচুলির গাদায় ফেললেন। ব্যাস, যেই না ফেলা, ওমনি সমস্ত শিয়াল একসঙ্গে বিকট চিৎকার করে উঠল। বোধহয়, ওভাবেই ওরা জ্যাঠামশাইকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। তারপর মিনিট খানেকও লাগল না। সমস্ত শিয়াল হাওয়া। বাচ্চাটাকে খুব সম্ভবত তার মা মুখে তুলে নিয়েছিল। এলাকা একেবারে শুনশান। জ্যাঠামশাই কটমট করে আমাদের দিকে তাকালেন। বুক শুকিয়ে গেল। কী জানি কী শাস্তি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য! না তা হয়নি। কয়েক মুহূর্তের নিরবতা। জ্যাঠামশাই হেসে বললেন, “কি রে আর শিয়াল পুষবি”? আমরা থ! সেই ভয়ানক মুহূর্তের কথা মনে পড়লেও আজও শরীরের রক্তনালিগুলোর মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ চলে যায়।

এই হচ্ছে শিয়াল। ভয়ানক ধূর্ত, সাঙ্ঘাতিক বুদ্ধিমান এবং অসম্ভব উপস্থিত বুদ্ধি। থাকে একা বা জোড়ায়। কিন্তু মারাত্মক সঙ্ঘবদ্ধ প্রাণী। আমার দেখা বন্যপ্রাণীদের মধ্যে সব চাইতে বুদ্ধিমান। বাঘও ওদের বুদ্ধির কাছে শিশু। পরবর্তী সময়ে জঙ্গলে আরও অনেকবার শিয়ালের বুদ্ধির নমুনা পেয়েছি।

যাইহোক এবার মূল বিষয়ে আসা যাক। এই শিয়ালদর আদি বাসস্থান হল উত্তর এবং পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপ এবং বার্মা নিয়ে গোটা দক্ষিণ এশিয়া। ভারতের এমন কোন অঞ্চল নেই, যেখানে এদের কোন না কোন উপ-প্রজাতির দেখা মেলে না। পৃথিবীর সমস্ত শিয়ালদের মধ্যে এরা আকারে সবচেয়ে বড়। আমাদের সোনালি শিয়াল হল আফ্রিকা, আফগানিস্থান, ইরান, থাইল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কার বাইরে একমাত্র শিয়াল প্রজাতি। ওই সমস্ত আরও কিছু শিয়াল প্রজাতি আছে। এরা মূলত গ্রীষ্মমন্ডলীর শুষ্ক প্রান্তর, মরুপ্রায় অঞ্চল, ঘাসজঙ্গল, হালকা বনভূমি এবং কৃষিক্ষেত্রের বাসিন্দা। আখ জাতীয় গাছের ক্ষেত এদের খুবই প্রিয়। এতে করে দুটি সুবিধা। এক, সহজে মানুষের নজরে আসে না। দুই, সারাদিন ঝোপের আড়ালে ছায়ায় বসে নিশ্চিন্তে ইঁদুর শিকার। চাষিভাইরা এমনিতেই ক্ষেতে জল দেয়। অতএব, জলের খোঁজেও পারতপক্ষে বেরতে হয় না। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই শিয়ালরা প্রধানত জোড়ায় জোড়ায় থাকে। শিয়ালের বড় দল সাধারণত দেখা যায় না। কখনও কখনও ৪/৫ টি শিয়ালকে একত্রে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু সেগুলো ওই জোড়ারই শাবক। বড় হওয়া পর্যন্ত শাবকরা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে। নানা কাজে তাদের সাহায্য করে। এরা খুব ছোট অঞ্চলে বসবাস করে। প্রত্যেক জোড়া নিজেদের এলাকা নির্ধারণ করে নেয়। অন্যান্য প্রাণীদের মত ‘মার্কিং ফ্লুইড’ এর ব্যবস্থা আছে। খুব সমস্যা না হলে একে অন্যের অঞ্চলে আসে না। ব্যতিক্রম গুরুতর সমস্যা। আগেই যা আলোচনা করেছি (বাচ্চা চুরি)। এইসব ক্ষেত্রে এলাকার সমস্ত শিয়াল মিলিত হয়। রীতিমত আলোচনা করে নিজেদের কিংকর্তব্য স্থির করে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শিয়ালদের এই ‘মিটিং’ এর কথা শুনেছি। আর নিজে চোখে তো দেখেইছি। তবে প্রজননকালে এরা ভীষণভাবে আঞ্চলিক। নিজেদের ২/৩ বর্গকিমি অঞ্চলে রীতিমত গন্ধবার্তা ছড়িয়ে অন্য শিয়ালের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। এটা হয়ত প্রজনন সংক্রান্ত ঝাঞ্ঝাট এড়ানোর জন্য। অন্য শিয়ালও তা মেনে চলে। ভারি সুন্দর বোঝাপড়া!

এশীয় শিয়ালরা দৈর্ঘ্যে ২৮-৪০ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। কাঁধের উচ্চতা ১৫-২০ ইঞ্চি। ইঞ্চি দশেকের, ঝালরের মতো লেজটি ভারি সুন্দর। দেহের ওজন ছোট কুকুরের মত। ৭/৮ কেজি থেকে সর্বাধিক ১৫ কেজি। অবশ্য পুরুষ শিয়াল, স্ত্রী-শিয়ালের চেয়ে সামান্য বড় হয়। অন্যান্য কুকুরবংশীয় প্রজাতির মত (ঢোল বাদে) এদেরও মোট দাঁতের সংখ্যা ৪২। স্ত্রী-শিয়ালের ৪/৮ টি পর্যন্ত দুগ্ধগ্রন্থি হতে পারে। যদিও বাচ্চার সংখ্যা সাধারণত ৪-এর বেশি হয় না।

আগেই বলেছি শিয়াল জোড়ে থাকে। ব্যতিক্রমি শাবক। শিয়াল জোড়ার মধ্যে এক অদ্ভুত মিল দেখা যায়। চলে যখন, দুটোই চলে। বসে যখন, দুটোই বসে। ঘুমোয় যখন, দুটোই ঘুমোয়। এক বনকর্মী একবার মজা করে বলেছিলেন, মলত্যাগ করে যখন তখনও দুটি একসঙ্গে। এটা হয়ত কথার কথা, যা এককথায় ওদের জোড়ার মিল বোঝাতে যথেষ্ট। তবে এটা ঘটনা যে, এত মিল অন্য প্রাণীদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। আর শিকার ধরা? সে তো অবশ্যই মিলিতভাবে। যদিও এটা অনেক প্রাণীর মধেই দেখা যায়। এতে সার্থকতার হার বাড়ে। সঙ্গে শাবক থাকলে তারাও শিকারে অংশগ্রহণ করে। শিকারের পর শাবকদের মুখে করে মাংসের টুকরো নিয়ে ডেরার দিকে ছুটতে দেখেছি। হতে পারে সঞ্চয়ের জন্য কিংবা ডেরায় অবস্থানরত বয়স্ক বা অসুস্থ সদস্যের জন্য। এরা নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কখনই বড় শিকার ধরতে চায় না। বরং বাঘ, লেপার্ডদের ফেলে যাওয়া বড় শিকারের উচ্ছিষ্ট খেয়ে স্বাদ মেটায়। নিজেরা ধরে ছোট শিকার। ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, বনমুরগি, পাখি ইত্যাদি। তবে যে সব জঙ্গলে বড় বড় হরিণের ঝাঁক আছে, সেখানে শিয়ালদের মহা আনন্দ। ধরা যাক, একটি হরিণের ঝাঁকে ১০০ টি পূর্ন বয়স্ক স্ত্রী হরিণ আছে। এদের বাচ্চাও জন্ম নেয় একই সময়ে। টানা ১০-২০ দিন ধরে বাচ্চা হওয়ার পালা। প্রতিদিনই কারোর না কারোর, কিংবা একই দিনে একাধিক হরিণের বাচ্চা হতে দেখা যায়। এক এক ঝাঁকে অগুন্তি শাবকের জন্ম হয়। তখন এদের ঝাঁকের পিছু ছাড়ে না শিয়াল। ফাঁক পেলেই টপাটপ বাচ্চা তুলে নিয়ে দে ছুট। সোজা ডেরায় নিয়ে গিয়ে জমা করে দেয়। আবার হরিণের পিছু নেয়। এভাবে এরা বেশ কিছুদিনের খাবার একেবারে মজুত করে নেয়। এতটাই বুদ্ধিমান প্রাণী এই শিয়াল। দেখা যায়, সিংহ বা লেপার্ড যখন শিকার ধরে, তখন সেই অঞ্চলের সবচেয়ে কাছে যে শিয়াল জোড়া থাকে, তারা প্রচন্ড চিৎকার জুড়ে দেয়। এখানে শিয়ালের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। শিয়াল বিলক্ষণ জানে যে, সিংহ বা লেপার্ড সম্পূর্ন শিকারটিকে খাবে না। খানিকটা খেয়ে ফেলে রেখে চলে যাবে। আর তখনই উচ্ছিষ্টের লোভে হায়না, শকুনের দল আসতে থাকবে। যাদের সঙ্গে শিয়াল একা বা জোড়ায় পেরে উঠবে না। তাই চিৎকার করে আশেপাশের সমস্ত শিয়ালদের জড়ো করতে থাকে, দল ভারি করার জন্য। নিমেষে অনেক শিয়াল, একত্রিত হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে, কখন সিংহ, লেপার্ড শিকার ছেড়ে চলে যাবে। যেই না সরল, অমনি ওরা গিয়ে হামলে পড়ল শিকারের চারপাশে। যাতে অন্য কেউ সহজে ঢুকতে না পারে। যার পাশ দিয়ে ঢুকতে যাবে, সে-ই খেঁকাবে। ফলে ওরা না ছাড়া পর্যন্ত অন্যদের ঢোকা মুশকিল। তা সে আকারে বড় হলেই বা কি! যতই হোক, সে তো একা। শিয়ালদের সম্মিলিত বাধা টপকানো তার পক্ষে সহজ নয়। এবার নিজেদের মধ্যে ভাগের প্রতিযোগিতা। কত তাড়াতাড়ি খাওয়া যায়, বা কত বেশি নিয়ে যাওয়া যায় (পেট ভর্তি থাকলে)। একটু ভাল করে লক্ষ্য ক করলেই দেখা যায়, প্রথমেই প্রতিটি শিয়াল সামনের দু’পা দিয়ে খানিকটা অংশে আঁকি কেটে নেয়। অর্থাৎ অতটা অংশ সেই নির্দিষ্ট শিয়ালটির। সেখানে অন্য কেউ ভাগ বসাবে না। যদি অংশীদারের সংখ্যা বেশি থাকে, তাহলে গতি আরও বাড়ে। চিবানোর সময়টুকুও নষ্ট করে না। তার আগে নিজে চিহ্নিত অংশের মাংস খুবলে কেটে নেয়। তারপর নাকের ডগা দিয়ে সেই টুকরোগুলোকে একজায়গায় জড়ো করতে থাকে। এরপর, খাওয়া শুরু এবং তারও পরে নিয়ে যাওয়া। এই হল শিয়াল। বোধহয় মাংসাশী বর্গের প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিশ্রেষ্ঠ!

শিয়ালদের আরও একটা লক্ষণীয় দিক হল, এদের আবেগপ্রবণতা। জোড়ার স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে জোরাল মানসিক বন্ধন থাকে। এই বিষয়ে আগেই আলোকপাত করেছি। সাধারণত দেখা যায়, জোড়ার যে কোন একটি শিয়াল মারা গেলে অন্যটি বেশিদিন বাঁচে না। আমাদের দেশের বাড়ির পিছনে একটা ডোবা ছিল। আমরা বলতাম পানা পুকুর। বেশ কিছু বিষধর সাপ থাকত (কেউটে) সেখানে। তাই ভয়ে বড় একটা কেউ যেত না। কোথা থেকে একজোড়া শিয়াল এসে ওই পুকুরের ধারে বাসা বেঁধেছিল। বাড়ির পিছনে নিয়মিত ওদের খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। সেই সময় প্রায় ১৫/১৬ মাস ওদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। জোড়াটির বাচ্চা-কাচ্চা হয়নি। তবুও দুটিতে অদ্ভুত ভালোবাসা ছিল। খেতে আসত-তাও জোড়ায়। একদিন আমি তখন কলকাতায়। খবর এল রাতে ইঁট-ভাঁটার লরি চাপা পড়ে পুরুষ শিয়ালটি মারা গেছে। শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। পরদিনই দেশে গেলাম। গিয়ে দেখি স্ত্রী শিয়ালটি একা মনমরা হয়ে কেঁদে কেঁদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খাবার দেখেও খেতে আসছে না। যা আগে কোনদিনও হয়নি। অনেক ডাকাডাকির পর তৃতীয় দিন একবার এল। প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে সামান্য খাবার মুখে তুলল। আবার কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।

তারপর আমাকে কলকাতায় চলে আসতে হল। তবে রোজই তার খবর নিতাম। একই অবস্থা চলছিল। এভাবে মাস-খানেক চলার পর সে মারা যায়। যদিও, স্তন্যপায়ী সব প্রাণীদের মধ্যেই কম-বেশি স্নেহ এবং আবেগপ্রবণতা থাকে। ‘প্রাইমেট’ দের (মানুষ সহ বাঁদর, হনুমান, উল্লুক, শিম্পাজি এবং গোরিলা) মধ্যে এই হঠাৎ নিঃসঙ্গতার হতাশা এবং ভয় ব্যাপারটা প্রকট হয়। বৈঞ্জানিক পরিভাষায় একে বলে ‘জ্যুকোসিস’। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে বিষয়টা তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেললেও, পরবর্তী সময়ে ততটা প্রাবল্য প্রকাশ পায় না। কিন্তু, ব্যতিক্রম এই ছোট্ট প্রাণী-শিয়াল! সাথীহারা শিয়ালের মুক্তি একমাত্র মৃত্যুতে! চিকিৎসা, বিঞ্জান, বুদ্ধি কোন কিছু দিয়েই তাকে বাঁচান যাবে না। এ এক অমোঘ বাস্তব!

মোটের উপর স্ত্রী-শিয়াল পুরোপুরি একগামী প্রাণী। পুরুষ শিয়ালও। তবুও স্ত্রী-শিয়ালের মন খানিকটা সন্দেহপূর্ণ। ঠিক মানুষের মত। তাই মাঝে মধ্যে দুটি স্ত্রী-শিয়ালকে অহেতুক ক লহে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রাতের বেলা নিয়মিত চিৎকার করে প্রত্যেক জোড়া তাদের অবস্থান সম্বন্ধে অন্যদের সচেতন করে। এই ডাক কিন্তু আহ্বানের ডাকের থেকে সম্পূর্ন আলাদা।

এই কাজে দলের সহযোগী নবীন সদস্যরা (অপ্রাপ্তবয়স্ক শাবক) বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা নেয়। শিয়ালের দলে এই সহযোগীরা অনেক দায়িত্ব পালন করে। এরা সাধারণত বাসার খানিক দূরে চারপাশে ছড়িয়ে থাকে। কোন বিপদ দেখলে বড়দের আগাম সতর্ক করতে থাকে। যাতে করে তারা কর্তব্য নির্ধারণের সময় পায়। এছাড়াও, এই সহযোগী শিয়ালরা প্রায়শই মুখে করে খাবার এনে দুগ্ধবতী মা কিংবা ছোট ছোট ভাইবোনদের খাওয়ায়। এদের সতর্কবার্তা পেলে মা-শিয়াল বাসা বদলায়। সুতরাং একটি শিয়াল পরিবারে সহযোগী শিয়ালদের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের বাস আছে, এমন জায়গায় শিয়াল সাধারণত দিনের আলোয় বেরোয় না। রাতেই শিকার ধরে। কিন্তু, নিরিবিলি জঙ্গলে প্রায় দিনের বেলায় এদের ঘুরে বেড়াতে দেখি। বরং না দেখলেই অবাক হই।

কথায় বলে ছাগলে কি না খায়! তা শুধু ছাগল কেন, শিয়ালই বা কি কম খায়? জাতে মাংসাশী, বে-জাতে সর্বাহারী। এদের খাবারের ৫০ ভাগ যদি মাংস হয়, তাহলে বাকি ৫০ ভাগ হল ফলমূল, শস্য এমনকি শাকসবজি পর্যন্ত প্রায় সবই। তবে শিকার হিসাবে এরা সাধারণত ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, পাখি, মুরগি, খরগোশ, ব্যাঙ, মাছ এবং নানরকম কীটপতঙ্গ ধরে খায়। মাটির কাছাকাছি পাখির বাসা পেলে তার ছানা কিংবা ডিম খেতেও কসুর করে না। এরপর সুযোগ পেলে ছাগল, ভেড়ার ঘাড়ও মটকে দেয়। ঝোপের মধ্যে মাটির কম্পন এবং ডালপালার নড়াচড়া দেখে এরা অব্যর্থভাবে শিকারের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইঁদুর ধরায় ওদের এই বিদ্যা বিশেষ কাজে আসে। তবে গেরস্ত যদি খাবার পরিবেশন করে, তাহলে পোস্ত- চচ্চরি,ভাত, শুক্তো, চাটনি, মাছ-মাংসের ঝোল, রুটি, লুচি, পরোটা, পায়েস কিংবা তেঁতুলের আচার কোনটাতেই অরুচি দেখিনি।

শিয়ালের গর্ভকাল কুকুরের মত। ৬২-৬৩ দিন। এক সঙ্গে ২-৪ টি শাবকের জন্ম হয়। জন্মের ১০/১২ দিন পরে তাদের চোখ ফোটে। ২-৩ মাস বয়স পর্যন্ত এরা মায়ের দুধ খায়। এইসময় এরা সচরাচর ডেরার বাইরে বোরোয় না। বড়জোর তার একটু আশপাশে ঘোরাফেরা করে। আবার মায়ের বকুনি খেলেই গর্তে ঢুকে পড়ে। ১০-১২ মাস বয়সে এরা পরিণত হয়। চিড়িয়াখানার খাঁচায় শিয়ালদের ১৫/১৬ বছর বাঁচতে দেখা গেলেও, প্রকৃতিতে এরা এতদিন বাঁচে না। বড়জোর ৮ থেকে ৯ বছর।

আমাদের এত পরিচিতি, এত কাছের, এত উপকারি একটি বন্য প্রজাতি এভাবে তিল তিল করে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাবে? আর আমরা নির্বোধের মত তা উপভোগ করব! কেন, “একটু সহানুভূতি কি শিয়াল পেতে পারে না! ও বন্ধু...।”