Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

মানেভঞ্জন হয়ে সান্দাক-ফু পৌঁছল ‘নেচার ইণ্ডিয়ান’
ঘুরে আসুন শিবঠাকুরের পাশের দেশে

শমীক গুপ্ত, নেচার ইণ্ডিয়ান, সান্দাকফুঃ ও বলল, সমতলের জঙ্গলে অনেক কাজ করেছি। এবার চলো ‘হিল ফরেস্ট’ দেখব। সিঙ্গালিলা চলো। আমি বললাম, তার মানে সান্দাক-ফু। ও বলল, ঠিক তাই। শিয়ালদা ষ্টেশন থেকে তিস্তা-তোর্সা ধরে পরদিন কাকভোরে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছলাম। সেখান থেকে একটা টাটা সুমো ভাড়া করে সোজা মানেভঞ্জন। পাহাড়ি পথে ২/৩ ঘণ্টার জার্নি। সময়টা ছিল মার্চ মাসের শেষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরমও বাড়ছিল। নেপালি ড্রাইভার বিপিন বলল, ‘সাব, সঙ্গে গরম জামা কাপড় এনেছেন তো? ওখানে কিন্তু খুব ঠাণ্ডা হবে।’ অ্যাঁ, এই গরমে গরম জামা কি হবে! লোকটা কি পাগল নাকি? পরে বুঝলাম, ও পাগল নয়। বরং উল্টোটাই ঠিক। চটজলদি সিদ্ধান্ত নিয়ে দুজনে দুটো কিট্-ব্যাগ সম্বল করে বেরিয়ে পড়েছিলাম। অভিঞ্জ ড্রাইভার আমাদের দেখেই হয়ত বুঝতে পেরেছিল, দুটো পাগলা খপ্পরে পড়েছে। তা নাহলে, মার্চ মাসে সান্দাক্-ফু যাচ্ছে, এইভাবে! যাই হোক পাহাড়েপশুরাজ সিংহ উঠতে থাকল আমাদের গাড়ি। দুটো পথে সান্দাক্-ফু পৌঁছনো যায়। প্রথম হল মিরিক, শুকিয়াপোখরি হয়ে মানেভঞ্জন। দ্বিতীয় পথটি হল শুকনা, তিনধরিয়া, কার্শিয়াং, সোনাদা, ঘুম হয়ে শুকিয়াপোখরি ঘুরে মানেভঞ্জন। পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেল। সেখানে পৌঁছে শুনলাম পাহাড়ে মারাত্মক কুয়াশা। সেদিন আর ওঠা যাবে না। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, সান্দাক্-ফু এবং ফালুট যাওয়ার ‘গেটওয়ে’ হল এই মানেভঞ্জন। বোল্ডার বেছানো প্রচন্ড চড়াই রাস্তা। একমাত্র ল্যান্ড-রোভার ছাড়া কোন গাড়ি ওপরে উঠতে পারে না। তাই ৬০ বছর আগে ইংরেজদের ছেড়ে যাওয়া সেই ল্যান্ড-রোভারগুলো আজও দিনপ্রতি ৫০০০ টাকা হারে ভাড়া খাটছে। তেলের খরচ আলাদা। তবে মানেভঞ্জন থেকে সান্দাক্-ফু মাত্র ৩২ কিলোমিটার রাস্তা। ল্যান্ড-রোভারে গেলে ৪-৫ ঘন্টা সময় লাগে। ট্রেকিং করলে ২ দিন। মানেভনঞ্জন থেকে আবার দুটি পথে সান্দাক্-ফু পৌঁছনো যায়। প্রথমটি ভারতের সীমান্ত বরাবর। অন্য পথটি নেপালের দিয়ে ঘুরে গেছে।

কুয়াশার দরুন সেদিন আর এগোতে পারলাম না। একটা ছোট মোটেলে উঠলাম। রাতে ঠান্ডা আরও তীব্র হল। এক’দু ডিগ্রি হবে। বাইরে দমকা বাতাসের ধাক্কা কাঠের মোটেলটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। সমুদ্রে গিয়ে জলের শব্দ অনুভব করছি। কিন্তু পাহাড়ে বাতাসের শব্দ এভাবে কোনদিন অনুভব করিনি।

পরদিন ভোর। কুয়াশার ঘনত্ব কমতে এগারোটা বেজে গেল। খাবারের যাবতীয় রেশন নিয়ে ওপরে উঠতে হবে। ল্যান্ড-রোভারের ড্রাইভার ছট্টু সবকিছু কিনে নিয়ে এল। যতই ওপরের দিকে উঠছি, ততই কুয়াশা এবং হাওয়ার দাপট বাড়ছে। এই দুর্যোগের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালাবে কি করে? বেশ ভয় করছিল। হিসেবে সামান্যতম ভুল হলে, কয়েক হাজার ফুট নিচে। আমি শহুরে ড্রাইভার। এ আমার কম্ম নয় অসম্ভব খারাপ বোল্ডারের রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যাওয়ার চেয়ে ট্রেকিং করা অনেক ভাল। দেহের সমস্ত অস্থি-মজ্জা ছেড়ে যাবার উপক্রম।

কিলোমিটার দুই এগোতেই বাঁদিকে দেখলাম অসংখ্য রংবেরঙের সারি সারি পতাকা। একই অভিমুখে পত্পত্ করে উড়ছে। ছট্টু বলল, ওটা চিত্রে গুম্ফা। পাহাড়ি বৌদ্ধদের ধর্মস্থান। গাড়ি এগিয়ে চলল। পরবর্তী হল্ট লামেদুরা। আরও তিন কিলোমিটার গিয়ে রুক্ষ পাহাড়ি বনানি। ডান হাতে অন্তহীন খাদ। জনপ্রাণীহীন শুনশান পাহাড়ের বাঁক। মাঝে দু-একটা খচ্চর গলার ঘন্টা দুলিয়ে রাস্তা পার হল। লামেদুরা পৌঁছে সেখানেই প্রথম একটা চায়ের গুমটি পেলাম।গ্লাস ভর্তি চা বানিয়ে দিল নেপালি মেয়ে কাঞ্চি। ভারি মিষ্টি দেখতে। ততোধিক প্রাঞ্জল। আমার সঙ্গে ও ছিল, তাই ভাব জমাতে পারলাম না।

সে যাইহোক, জৈববৈচিত্র্যের দিক থেকে এই অঞ্চলটি খুবই সমৃদ্ধ। ইন্দো-মালোয়ান, অরিজিনের অসংখ্য অচেনা উদ্ভিদ দেখছিলাম। বেশিরভাগ চিনি না। যদিও হিমালয়ের ওই অঞ্চলটি রডোডেনড্রনের দেশ বলেই জানা ছিল। লামেদুরা থেকে মেঘমা এবং মুরসাই হয়ে টুমলিং প্রায় ৬ কিমি. পথ। এখানে অসংখ্য ওক, ম্যাপেল, ঘোক এবং ধেংরি শাল চোখে পড়ল। প্রকৃতিকে উপভোগ করছিলাম। প্রত্যুত্তরে প্রকৃতিদেবী আমাদের শরীরে হিমেল হাওয়ার ছুঁচ ফোটাচ্ছিল। প্রায় ১৫০ কিমি. বেগে বয়ে চলা বাতাসের ধাক্কা মাঝে মাঝে পথ আগলে বসিয়ে দিচ্ছিল। হাঁটা দুস্কর। চর্তুদিকে পাহাড়ের সারি, পাহাড়ের ঢেউ। কোনটা সবুজ সতেজ, কোনটা বা রুক্ষ। সান্দাক্-ফু যাওয়ার মধ্যপথে বা পাহাড়ের মাঝারি উচ্চতায় মখমলের মত ফুটে রয়েছে লাল রডোডেনড্রন। বৈঞ্জানিক নাম ‘রডোডেনড্রন হক্সানি’। যা কিনা এখানকার প্রধান আকর্ষণ। হালকা হলুদ রঙেরও কিছু রডোডেনড্রন দেখলাম। শহরের রাস্তায় যেমন কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া এখানের তেমনি রডোডেনড্রন। পরে জেনেছি, শুধু ইন্দো-মালয় নয়, এখানকার বৃক্ষবৈচিত্র্যে ভূমধ্যসাগরীয় প্রভাবও রয়েছে। তাই জৈববৈচিত্র্য বিচারে দার্জিলিং জেলার এই অঞ্চলটি প্রাচন্ড সমৃদ্ধ। এছাড়াও চাঁপ, সিলভার, ওক এবং অন্যান্য কর্নিফার জাতীয় বৃক্ষের বৈচিত্র্যও চোখে পড়ল। তবে নেপালের দিকে রডোডেনড্রনের সমারোহ অপেক্ষাকৃত বেশি। মেঘমায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একটি ঘাঁটি আছে। আমাদের কোন রকম শীতবস্ত্র ছাড়া ওখানে দেখে সুঠামদেহী সেনারা অবাক হয়েছিল। বললাম, ‘আনতে ভুলে গেছি।’ মেঘমা হল ভারত নেপাল সীমান্ত। চার-পা এদিক আর ওদিক। ওরাই আমাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে কয়েকটা গরম জামা কাপড় কিনে দিল। যত্ন করে কফি খাওয়াল।

দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে গেল। এমন কুয়াশা নেমে এল যে সামনে দাঁড়িয়ে একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তার মধ্যে দিয়েই ছট্টু গুড়গুড় করে গাড়ি নিয়ে এগোতে থাকল। দশ কিলোমিটার এগিয়ে গৈরিবাস পৌঁছলাম। ওখানে বনদপ্তরের একটা গেস্ট হাউস আছে। না, আমরা ওখানে থাকিনি। বরং আশপাশ ঘুরে লাল পাণ্ডার খোঁজ করছিলাম। না, তাদেরও দেখা মেলেনি। তবে, এই গৈরিবাস হল পশ্চিমবাংলায় লাল পান্ডাদের অন্যতম প্রাকৃতিক বাসভূমি। পরে দার্জিলিং চিড়িয়াখানায় গিয়ে লাল পাণ্ডা দেখেছি। না ইঁদুর, না বাদুড় না ভাল্লুক – এক অদ্ভুত সুন্দর প্রজাতি। গাছের পাতা, ফুল, পাপড়ি খেয়ে বেঁচে থাকে। প্রাণীজগতের শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী লাল পাণ্ডা হল মাংসাশী বর্গের এ্যালুরোপিদি পরিবারের একমাত্র প্রজাতি। এদের অন্য একটি প্রজাতি চীন দেশে আছে। তারা হল জয়েন্ট পাণ্ডা। বর্তমানে লাল পাণ্ডা প্রকৃতিতে বিপন্ন হয়ে পড়ছে, বিলুপ্তপ্রায়।

সংরক্ষিত প্রজাতির ‘রেডলিস্ট’-এ এদের নাম উঠে গেছে। জানি না, প্রকৃতিতে এরা আর কতদিন টিকে থাকবে! গৈরিবাস থেকে কেয়াকাটা হয়ে কালিপোখরি পৌঁছলাম। ওখানে একটা হ্রদ আছে। চারপাশে পাহাড় ঘেরা। আশপাশে কিছু মানুষের বসতি আছে। অতওপরে এবং ওই ঠান্ডয় জলাশয় দেখে অবাকই হয়েছিলাম! কী জানি বাবা, শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় তো জল জমে বরফ হয়ে যায় শুনেছি! এখানে আবার ব্যাতিক্রম হল কী করে? স্থান বিশেষে প্রকৃতিদেবীর নিয়ম কি তাহলে আলাদা নাকি? হ্যাঁ, তাই বোধহয় হবে। নিউটনের সূত্রও নাকি মহাশূন্যে অচল। যাইহোক, কালিপোখরি পৌঁছতেই প্রচুর মেঘ আর কুয়াশার মিশেল আমাদের ঢেকে ফেলল। ভিজে সিক্ত হচ্ছিলাম আর ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছিলাম।

কালিপোখরি থেকে সান্দাক্-ফু খুব একটা দূর নয়। বিবেকভঞ্জন হয়ে মাত্র ৭ কিলোমিটার। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত পর্বত মালা। কি দেখা যায় না সেখান থেকে? তুষার ধবল কাঞ্চনজঙ্ঘা, মাউন্ট এভারেস্ট, মাউন্ট লোটাস, মাউন্ট মাকালু আরও কত পর্বতশৃঙ্গ। পাহাড়ের কোলে ছোট ছোট গ্রাম, কাঠের বাড়ি, পাহাড়ি ছাগল আর চমরি গাইদের খোঁয়ার। আর ঘরে ঘরে ভাটিখানা। ‘হোম –ট্যুরিজম’ ভালই চলছে। প্রচুর বিদেশি এখানে আসেন। তাঁরা ওই পাহাড়ি গ্রামগুলোয় আশ্রয় নিয়ে প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ অনুভব করেন। ভারতীয় পর্যটক স্বাভাবিকভাবেই কম। আর যারা যান, ‘ফায়ার প্লেস’ সমেত সুসজ্জিত হোটেল খোঁজেন। পর্বতারোহীদের কথা আলাদা। আর শীতকাতুরে জবুথবু ভাতাহারি বাঙালির সংখ্যা তো নগণ্য। দিনের তাপমাত্রা চার-পাঁচ ডিগ্রি। রাতে শূণ্য থেকে মাইনাস চার ডিগ্রি পর্যন্ত চলে যাচ্ছিল। কাঠের জ্বালে চায়ের জল বাষ্পীভূত হচ্ছিল। তাই চা খাওয়া দুস্কর। চাল, ডাল মিশিয়ে একটু খিচুড়ি করতে গিয়ে দেখলাম ঘণ্টা তিনেক পেরিয়ে যাছে। অগত্যা খই, মুড়ি-মুড়কি খেয়ে ক্যাটিয়ে দিলাম ক’টা দিন।

কাঞ্চনজঙ্ঘার বুকে ভোরের সূর্যোদয় ক্যামেরাবন্দি করতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সত্যিই অনবদ্য সেই দৃশ্য। যা কোনদিনই স্মৃতি থেকে মুছে যাবে না। সেই তৃপ্তির স্বাদ আস্বাদন করতে করতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম পাহাড়ের আনাচ-কানাচে। লক্ষ্য করছিলাম, বৃক্ষরাজির বৈচিত্র্য। প্রচুর ঔষধি গাছের সমারোহ দেখলাম। এ্যাকোটেনিয়াম, ভেক্সিনিয়াম প্রভৃতি অসংখ্য প্রজাতির ঔষধি গুল্মরাজি। সত্যি বলছি, ওই স্বচ্ছ নীল আকাশের নিচে হারিয়ে যেতে সকলেরই ভাল লাগবে। ফিরে আসতে মন চাইবে না। তবু আমাদের ফিরতেই হবে দৈনিক জীবনে। ফিরলামও তাই। সেই মানেভঞ্জন হয়ে নিউ জলপাইগুড়ি। ফেরার পথে দুজনের সেই বোঝা বাড়ল। এক ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ছট্টু আমাদের গড়গড় করে নামিয়ে নিয়ে এল মানেভঞ্জনে। বিপিন টাটা সুমো নিয়ে সেখানে অপেক্ষা করছিল। আমাদের ফিরতে দেখেই একগাল হাসি হেসে সামনে দাঁড়াল। জিঞ্জেস করল, ‘স্যার, আজই ফিরবেন তো?’ ব্যাটা বড় ফচকে। নিমেশে আমাদের মনের অন্দরে পৌঁছে গেছে! কপট গাম্ভীর্য দেখিয়ে ওকে বললাম, না আজ ফিরব না। যা বললাম না, তা হল ‘ওর সঙ্গে হেথায় আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা।’ সেটা উহ্য রাখলাম। ও যা বোঝার বুঝুক গে যাক। তাতে আমাদের কী বা যাবে আসবে? ফিরতি পথে মানেভঞ্জনে আরও একটা সুন্দর রাত কাটিয়ে দিলাম।

রাতজাগা চোখে পরদিন কাকভোরে মনকে শক্ত করে শিলিগুড়ি ফিরে এলাম। বেশ বুঝতে পারছিলাম, ফেরার পথে মনের অনুভূতিগুলোকে একে একে গলা টিপে খুন করছিলাম! ‘ও’ কাঁদছিল। অনেকেই হ্য়ত কাঁদে। আর কাঁদবেই না-ই বা কেন? প্রকৃতির নির্মল পবিত্রতা ছেড়ে এই নিরস বাস্তবে ফিরে আসতে কার আর মন চায়! কী মরতে গঙ্গা যে বঙ্গোপসাগরে নেমে এসেছিল তা কে জানে! আসলে সে বোধহয় তখন নাবালিকা ছিল। ভগীরথ নিশ্চয় তাকে ফুঁসলে নিয়ে এসেছিল! তবে আমাদের কেউ ফোঁসলায়নি। টাকা ফুরিয়ে গিয়েছিল। রসদে টান পড়লে সবাইকেই বোধহয় নিচে নামতে হয়। এটাই বাস্তব। অধিবাস্তব!