Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

উন্নয়ন বনাম পরিবেশ
কাগজে কলমে পূর্ব-কলকাতা জলাভূমি

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান, কলকাতাঃ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে জলা। বুঁজে উঠছে পুকুর। অবশ্যই মানুষের প্রয়োজনে। হ্যাঁ, শহর কলকাতার উপকন্ঠে। কাগজ-কলমে বলা হচ্ছে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি বা ‘ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ড’। যা মোটামুটি উত্তর অক্ষাংশ বরাবর ২২ ডিগ্রি ২৫ মিনিট থেকে ২২ ডিগ্রি ২৪ মিনিট এবং দ্রাঘিমাংশ বরাবর ৮৮ ডিগ্রি ২০ মিনিট থেকে ৮৮ ডিগ্রি ৩৫ মিনিট পর্যন্ত বিস্তৃত। জায়গাটা পূর্ব কলকাতার শেষ প্রান্ত থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ এই নির্দিষ্ট ভূমিক্ষন্ডের পশ্চিম ভাগে রয়েছে শহর কলকাতা, উত্তর-পশ্চিমে লবণ হ্রদ এবং উত্তর-পূর্বে রাজারহাট। এর পশ্চিম বরাবর ‘ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস’।

পূর্ব কলকাতা জলাভূমির মোট পরিমাপ ১২.৭৪১ হেক্টর, যার মধ্যে নথিভূক্ত জলাভূমির পরিমাপ ৪,৭২৮.১৪ হেক্টর, পতিত জলাভূমি অঞ্চল ১,১২৪ হেক্টর, কৃষিক্ষেত্র ৪৯৫৯.৮৬ হেক্টর। শহরতলি এবং গ্রামীণ ক্ষেত্র ১৩২৬.৫২ হেক্টর এবং ধাপা ৬০২.৭৮ হেক্টর। বর্তমানে ৩০ টি মৌজা সরাসরি এই ঘোষিত অঞ্চলের অধীনে পড়ছে এবং আরও ৭ টি মৌজা আংশিকভাবে এর আওতায় পড়ছে।

১৯৯২ সালে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী রাজ্য সরকার এই জলাভূমি অঞ্চলটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। সেই উদ্দেশ্যে সরকার একটি পরিচালন সমিতিও গঠন করে ২০০৪ সালে। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল উক্ত জলাভূমি সংরক্ষণের একটা রূপরেখা তৈরি করা। ২০০৬ সালে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (সংরক্ষণ ও পরিচালনা) নামে একটি আইনও প্রণয়ন করা হয়। যে আইনে সম্পুর্ণ অঞ্চলটিকে ভূমির ব্যবহার অনুযায়ী ৪ টি ভাগে ভাগ করা হ্য়ঃ

১) জলাভূমি

২) কৃষিক্ষেত্র

৩) খামার অঞ্চল

৪) শহর ও গ্রামীণ বসতি

এখন দেখা যাক জলাভূমি বলতে ঠিক কি বোঝায়? এখানে মনে রাখতে হবে, জলাভূমি কখনই জলাশয় হতে পারে না। ছবির মত বোঝাতে গেলে বলতে হয়, জলাভূমি হল সেই ভূখন্ড যেখানে অত্যধিক কাদামাটি এবং জল থাকার ফলে কোন মানুষ সহজে হাঁটতে পারবে না। সুতরাং বলা যেতে পারে জলাভূমি হল সেই ভূখন্ড, যা কিনা ভূমি এবং গভীর জলাশয়ের ম ধ্যবর্তী অঞ্চল।

এখন প্রশ্ন হল এই জলাভূমি সংরক্ষণ নিয়ে এত হইচই কিসের? প্রকৃতিতে এই জলাভূমির অবদানই বা কতটুকু? এইসব স্বাভাবিক প্রশ্নের একটাই উত্তর। জলাভূমিকে বলা যেতে পারে জিনের একটা আস্ত চৌবাচ্চা বা ‘জেনেটিক রিজার্ভার’। কয়েক হাজার বিবর্তনশীল এবং বিবর্তনযোগ্য জিনের আধার হল এই জলাভূমি। প্রাকৃতিক নিয়মে বিবর্তন চলছে, চলবে। তার গতিকে থামাতে গেলে সমূহ বিপদ। বদ্ধ জলে মশা ডিম পাড়ে। চলমান জলস্রোত তা হয় না। প্রকৃতির এমনই নিয়ম। বিবর্তনও একটা প্রাকৃতিক পদ্ধতি। একে কৃত্রিমভাবে থামাতে গেলে তার কু-প্রভাব স্বাভাবিক। মধ্যবর্তী অঞ্চল। সুতরাং জলাভূমিকে সংরক্ষণ করতে হবে আমাদের নিজেদের স্বার্থে। একবার ইউ.এন.ই.পি (ইউনাইটেড নেশন এনভায়রনমন্ট প্রোগ্রাম)-এর বিশ্ব সংরক্ষণ এবং পর্যবেক্ষণ (ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন মনিটরিং সেন্টার) কেন্দ্র সারা বিশ্বের জলাভূমির এক আনুমানিক হিসেব করেছিল। যাতে করে দেখা যাচ্ছে, সারা পৃথিবীতে ৫.৭ মিলিয়ন বর্গকিমি অঞ্চল হল জলাভূমি। যা কিনা গোটা বিশ্বের আয়তনের প্রায় ৬%। সমীক্ষাতে আরও দেখা যাচ্ছে, এই জলাভূমির মধ্যে ২% হ্রদ, ৩০% বিল, ২৬% অগভীর জলাশয়, ২০% কাদা এবং ১৫% হল বন্যাপ্রবণ অঞ্চল। এখানে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় যেটা তা হল ভূপৃষ্টের মাত্র ৬% অঞ্চল, ২০% জৈব বৈচিত্র্যের আধার। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে জলাভূমি মানুষের সমাজ, তথা গোটা পৃথিবীকে নিঃশব্দে টিকিয়ে রেখেছে। আপাত চোখে দেখতে গেলে জল সংরক্ষণ, ঝড় এবং বন্যার প্রাবল্য কমানো, ভূমিক্ষয় রোধ করা, ভূ-গর্ভস্থ জলের উদ্গীরণ, জল পরিশ্রুতি-করণ, খনিজ ধারণ, বিভিন্ন স্তর নিয়ন্ত্রণ, দুষণকণা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় আবহাওয়া তথা বৃষ্টিপাত, আদ্রতা এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে জলাভূমির গুরুত্ব অপরিসীম।

অন্যদিকে এই জলাভূমিকে বিশ্বের সর্বোচ্চ উৎপাদনশীল পরিবেশ বলেই গণ্য করা যায় যা আগেই বলেছি। এছাড়াও শহরাঞ্চলকে প্রয়োজন, অপ্রয়োজনে বিপুল পরিমাণ জলের যোগান, মাছ চাষের ক্ষেত্র, কৃষিক্ষেত্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জৈব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে জলাভূমির গুরুত্ব রয়েছে, যাকে ক্রমাগত দূষিত করছে বিশাল ধাপা অঞ্চল বা আর্বজনার স্তুপ। বৃষ্টির সময়ে এই আবর্জনা ধোয়া জল গড়িয়ে যাচ্ছে নিকটবর্তী জলাশয়গুলোতে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রণালীর মাধ্যমে সেই জল গিয়ে মিশছে মাছের ভেড়িতে। এই অপরিশ্রুত জলে দীর্ঘদিন ধরে মাছ চাষ করে আসছেন বাস্তুতন্ত্রের জালিকা বিন্যাস এবং স্থানীয় অর্থনীতি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, এই পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে মোট ২৬৪ টি নথিভুক্ত মাছের ভেড়ি আছে। যার মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ৭০ লক্ষ কুইন্টাল মাছ। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই জলাভূমিতে প্রায় ৮৫০০ মানুষ মাছ চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছেন কম করে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ। এখানে মনে রাখতে হবে, এই জলাভূমি অঞ্চল বাইরে থেকে কোনরকম আর্থিক যোজনা, দক্ষ কর্মী প্রভৃতির সাহায্য ছাড়া, কেবলমাত্র ৭০০ বৃষ্টির মিলিয়ন লিটার শহরের তরল বর্জ্য ও যোগানের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই বিশাল অর্থনীতি। বিকল্প পথে এই উৎপাদন করতে গেলে বছর প্রতি আনুমানিক ২০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। শহর কলকাতার উপকন্ঠে এই জলাভূমি থাকার ফলে পণ্য পরিবহনের খরচও অনেকাংশে কমে যাচ্ছে। খাল হয়ে কুলটি গাঙে গিয়ে পড়ছে। এখানে পূর্ব-কলকাতা জলাভূমি আরও একবার তার উপযোগিতার কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

আরও একটা জিনিস জানানো প্রয়োজন। পূর্ব-কলকাতা জলাভূমি হল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বর্জ্য যোগানদার কৃষিক্ষেত্রে। যার পরিমাপ প্রায় ৪,৯৬০ হেক্টর। এই সুবিশাল কৃষিক্ষেত্রে পুষ্টির যোগান দিচ্ছে শহর কলকাতা। প্রতিদিন প্রায় ৩,৫০০ টন পৌর বর্জ্য পদার্থ জমা পড়ছে নিকটবর্তী ধাপায়।

এখন সমস্ত দিক বিচার করে, এই সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে যে, শহর কলকাতার উপকন্ঠে এই সুবিশাল জলাভূমি অঞ্চলকে আমরা আদেও টিকিয়ে রাখব, না কি গতানুগতিক ধারায় তাকে ধীরে ধীরে বুঁজিয়ে ফেলে তথাকথিত ঊনয়নবৃত্তে সামিল করব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি পরিসেবামূলক কাজ কিংবা অন্যান্য অছিলায় এভাবে জলাভূমি বুঁজিয়ে ফেলা বোধহয় ঠিক কাজ হচ্ছে না। বাতাস, জল আর জমি ছাড়া মানুষ বাঁচবে তো? আইন দিয়ে, আইন করে জলাভূমি সংরক্ষণ করা বড়ই কঠিন কাজ! হয়ত বা অসম্ভব।