Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

দেবী দূর্গার চালচিত্র ভীষণভাবে প্রতীকী
গির-এর গেরোয় পশুরাজ সিংহ

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ানঃ দেবী দূর্গা ছিলেন পার্বত্য হিমালয়ের অধিশ্বরী। তাই দেবীর অপর নাম পার্বতী-ও বটে। এবার দেবী দূর্গার আরাধ্য চালচিত্রটি কল্পনা করা যাক। দেখা যাচ্ছে দেবীর ডানদিকের কিছুটা নিচে অবস্থান করছে তাঁর বাহন সিংহ। বাঁ-দিকের নিচ থেকে উঠে আসছে মহিষাসুর। একটু সুক্ষ ভাবলেই দেখা যাবে যে দেবী-চালচিত্রের এই অবস্থানগত চিত্র ভীষণভাবে প্রতীকী এবং ইঙ্গিতপূর্ণ।

আজকের বিভিন্ন জীব-ভৌগলিক গবেষণাপত্র প্রমাণ করছে যে সিংহদের ভারতে আগমন ঘতেছিল হিমালয়ের ওই দক্ষিণ-পশ্চিম পথ ধরেই (ডানদিক)। অর্থাৎ সুদূর আফ্রিকা মহাদেশের মিশর দেশ থেকে জেরুজালেম, জর্ডন, ইরাক, ইরান এবং পাকিস্থান হয়ে। মধ্যে কায়রো, খুব সম্ভবত লোহিত সাগরের বুকে তাদের সেতু-সমুদ্রমের কাজ করেছিল।

আর মহিষাসুর? সে তো নিচ থেকে উঠে আসছে, অর্থাৎ সুদূর দাক্ষিণাত্য। এবার দেবী দূর্গাকে যদি আর্য্য জাতির প্রতিনিধি কল্পনা করা যায় তাহলে দেবী চালচিত্র সম্পূর্ণত আর্য-অনার্য সংঘাতের এক সু-কল্পিত প্রতীক মাত্র। যা পুরাণোত্তর কালেও বারবার ভারতের ইতিহাসে প্রতীয়মান হয়েছে। আর ওই আর্য অনার্য সংঘাতে অনার্যরা খুব সম্ভবত দক্ষিন-মধ্য ভারতের গৌর’দের (মহিষ) ব্যবহার করেছিল। এদিকে গৌর আক্রমণ প্রতিহত করতে আর্যরা সিংহদের কাজে লাগায়। আমি নিশ্চিত যে বিদগ্ধজনেরা হয়ত এই বিষয়ে আরও ভালভাবে আলোকপাত করতে পারবেন। যাইহোক, আমাদের বিষয় পশুরাজ সিংহ। সেখানেই ফেরা যাক।

বিবর্তনের ধারায় সিংহের উৎপত্তিস্থল এশিয়া না আফ্রিকা মহাদেশ- তা নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য আছে। যদিও আফ্রিকার দিকেই পাল্লা ভারি। এশিয়া এবং আফ্রিকা এই দুটো মহাদেশেই সিংহ আছে, এবং এদের মধ্যে আকৃতি এবং আচরণগত বিশেষ পার্থক্য নেই। আফ্রিকান সিংহ’র চেয়ে এশীয় সিংহ’র আকার অপেক্ষাকৃত ছোট এবং লেজ সামান্য বড়। আবহাওয়া, প্রকৃতি এবং খাদ্যের প্রতুলতা এবং বাসস্থানগত তারতম্যের জন্য ওই সামান্য পার্থক্য কেবল সিংহ’র ক্ষেত্রে নয় যে কোন জীব এমনকি উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। অত অতএব এশীয় ও আফ্রিকান সিংহ যে আলাদা আলাদাভাবে বিবর্তিত হয়েছে, সেইরকম ভাববার বড় একটা অবকাশ নেই। যেটা বাঘেদের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে বলা খুবই কঠিন। কারণ সারা পৃথিবীতে বাঘেদের আটটি উপপ্রজাতির মধ্যে প্রচুর বৈসাদৃশ্য দেখা যায়। সিংহের ক্ষেত্রে তা কিন্তু মোটেই নয়। সুতরাং ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে, এরা ভারতীয় বংশদ্ভুত নয়। বরং বলা যেতে পারে, তারা ভারত তথা এশিয়া মহাদেশে অনুপ্রবেশকারী। এখন দেখা যাক অতীতে সিংহ’দের ভৌগলিক বিস্তার কিরকম ছিল?

সিংহ সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত আমরা গাজিসবার্গ সাহেবের নথিকেই(১৯৬১) প্রামাণ্য বলে মেনে নিই। যদিও অ্যারিস্টটলের লেখাতেও সিংহ’র উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যভাগে ‘ব্ল্যাক-সি’ সংলগ্ন বলকান অঞ্চলে সিংহ’র উপস্থিতি ছিল। অর্থাৎ রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রিস, যুগোশ্লেভিয়া প্রভৃতি অঞ্চল। ইউরোপের কোনও এক সম্রাট ৪৮০-তে ম্যসিডোনিয়াতে আগ্রাসন চালান। সেই অভিযানে তাঁর সেনাবাহিনীর প্রচুর উট নাকি সিংহ’র আক্রমণে মারা যায়। এদিকে হেপনার এবং স্লাডস্কি’র লেখা (১৯৭২) থেকে জানা যাচ্ছে যে অন্তত নের দশম শতাব্দি পর্যন্ত আজেরবাইজান অঞ্চল অর্থাৎ কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী সোভিয়েত রাশিয়া, তুর্কি এবং জর্জিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে সিংহ’র উপদ্রব ছিল। ক্রমে আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওই সমস্ত অঞ্চলে শক্ত ফলাযুক্ত মুলি বাঁশ, পেস্তা, এবং চিরসবুজ গুল্মবন বেড়ে যাওয়ায় তা তাদের বাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। অবশ্য এর সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, উন্নয়ন এবং বন্যপ্রাণী হত্যার চাপও ছিল। তবে কাস্পিয়ান সাগর অদূরবর্তী কাজাকিস্থান লাগোয়া রাশিয়ার সামারা অঞ্চলে আর প্রায় দুশো বছর (দ্বাদশ শতাব্দির শেষ ভাগ পর্যন্ত) সিংহরা দৌরাত্ম্য চালিয়েছিল। অন্যদিকে, উত্তর আফ্রিকার একদম পশ্চিমে মরক্কোতে প্রায় অষ্টাদশ শতাব্দি পর্যন্ত সিংহ’র অস্তিত্ব ছিল। বিশেষ করে উত্তর আটলান্টিক তীরবর্তী অঞ্চলে। অনেক পর্যবেক্ষকদের মতে, মরক্কোর উচ্চ পার্বত্য (৩০০০-৯০০০ ফুট) অংশে ১৯৪০ এর দশক পর্যন্ত নাকি সিংহ’রা বিরাজ করত।

কনস্টানটাইন থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে বাটনাতে ১৮৯৩ সালে শেষ সিংহ শিকারের খবর পাওয়া যায়। অর্থাৎ মরক্কো পার্শ্ববর্তী আলজেরিয়াতেও সিংহের উপস্থিতি ছিল। আবার আলজেরিয়া পার্শ্ববর্তী (উত্তর-পূর্ব) ছোট্ট দেশ টুনিশিয়াতেও সিংহ শিকারের ইতিহাস মেলে ১৮৯১ সালে। উটসের (১৯৯০) লেখা থেকে জানা যায় যে, ১৮৭০ সালেও তুর্কী দেশের ইউফ্রেটিস অঞ্চলে সিংহ হত্যা হয়েছে। সেই সময়ে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস অববাহিকায় প্রচুর সিংহ ছিল বলেই জানা যায়। আবার তুর্কী সংলগ্ন সিরিয়াতেও ১৮৯১ সালে সিংহ’র উপস্থিতির খবর দিচ্ছেন স্যার আলফ্রেড পেজ্। পরবর্তী সময়ে ১৯২০ তে কিনার এর লেখাতেও তার উল্লেখ পাওয়া যায়। অতএব সিংহ’র এশিয়া আগমন যে সুদূর আফ্রিকা থেকে, সে বিষয়ে বিশেষ সন্দেহের অবকাশ নেই। প্রায় গোটা উত্তর আফ্রিকা এবং সংলগ্ন এশীয় দেশগুলোতে সিংহ’রা এক সময়ে বিস্তার লাভ করেছিল। পরবর্তী সময়ে ক্রমে তারা এশিয়ার আরও দক্ষিণ-পূর্বে পাড়ি জমায়। হাট্-এর লেখাতে (১৯৫৯) ইরাকেও সিংহ শিকারের উল্লেখ আছে ১৯১৮ সালে। সিংহদের দৌ্রাত্ম্যে ১৮০০ সাল পর্যন্ত ইরানের সিরাজ অঞ্চল ছিল মানুষের ত্রাস। হিনি’র লেখা (১৯৪৩) থেকে আরও জানা যায় যে ১৯৪২ সালেও ইরানের ডিজবুল-এ ট্রেনলাইন পাতার সময়ে এক মার্কিন ইঞ্জিনিয়ার এক জোড়া সিংহ দেখতে পান। তবে অবাক ব্যাপার, মধ্য কিংবা পূর্ব ইরান, আফগানিস্থান বা বালুচিস্থানে কিন্তু সিংহ’র অস্তিত্বের খবর পাওয়া যায় না। অথচ ১৮১০ সালেও পাকিস্থানের সিন্ধু প্রদেশে সিংহ হত্যার ইতিহাস আছে। কোয়াটাতেও সিংহ দেখা গেছে ১৯৩৫-এ।

অবশেষে ভারত। স্বাধীনতা বিভক্ত ভারতবর্ষ। পাকিস্থানের সঙ্গে সীমান্ত চুড়ান্ত হল জম্মু-কাশ্মীর, পাঞ্জাব, রাজস্থান এবং গুজরাট বরাবর। যেহেতু ইরান পরবর্তী দেশ আফগানিস্থানে সিংহ’র অস্তিত্বের খবর পাওয়া যায় না, অথচ পাকিস্থানে পাওয়া জায়ম সেহেতু অনুমান করা যেতেই পারে যে পাকিস্থানের উত্তরভাগেও সিংহদের বিস্তার ঘটেনি। বরং মধ্য থেকে দক্ষিণ পাকিস্থানে ওদের উপস্থিতি ছিল। সেখান থেকে তারা ক্রমে ডানদিকে এসে সোজা ঢুকে পড়ে ভারতের রাজস্থান-গুজরাট অঞ্চলে। তবে স্বাধীনোত্তর ভারতীয় সীমানায় সিংহ’রা যে কোন সময় আগ্রাসন চালিয়েছিল, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য মেলা ভার।

এদিকে আরবল্লী পর্বতমালা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সমান্তরালে অবস্থানের দরুন রাজস্থান হল বিস্তীর্ণ মরু অঞ্চল। সমুদ্রের অবস্থানও বহুদূরে। সব মিলিয়ে রাজস্থান কখনই সিংহদের বাসযোগ্য ছিল না। অন্যদিকে গুজরাটের শুষ্ক বনভূমি এবং লাগোয়া সমুদ্রতট সিংহদের আদর্শ বাসভূমি। অতএব তারা ভারতের গুজরাটেই প্রথম অবস্থান করল। এর পরের পরিস্থিতি আরও জটিল। ১৮১৪-তে বিহারের পালমৌ (বর্তমানে ঝাড়খন্ড) বনাঞ্চলে একটি সিংহ হত্যার নথি পাওয়া যায়। ওড়িশাতেও সিংহ’রা আগ্রাসন চালিয়েছিল। খুব সম্ভবত সমুদ্র তীরবর্তী বনাঞ্চল থাকার কারণে। এদিকে কিনার-এর লেখা (১৯২০) থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৯৪৭-৪৮-এ নর্মদা তীরবর্তী দামহো জেলাতেও সিংহ মারা হয়েছে। যা বর্তমানে মধ্যপ্রদেশের অন্তর্গত। সিংহদের পশ্চিম থেকে পূর্বে এতদূর বিস্তারের কারণ সম্ভবত একই নদী বা সমুদ্র সংলগ্ন অপেক্ষাকৃত শুষ্ক বনভূমি। নর্মদা তীরবর্তী কানহা ব্যাঘ্র সংরক্ষিত বনাঞ্চল আজও ওই একই ধরনের বনভূমির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। এ তো গেল সিংহদের মধ্য এবং পূর্ব ভারত অভিযানের কথা। এবং তার স্বপক্ষে যথার্থ কারণও খুজে পাওয়া গেল। কিন্তু এরপর অবাক কাণ্ড! গুজরাট থেকে সোজা দিল্লি চলো অভিযান(রাজস্থান টপকে!)। খুব সম্ভবত মধ্যপ্রদেশ হয়ে। ব্লানফোর্ড-এর রচনায় (১৮৯১) দেখা যাচ্ছে, ১৮৫৬-৫৮ এর মধ্যে দিল্লি সংলগ্ন অঞ্চলেই কমপক্ষে ৫০-টি সিংহ মারা হয়েছে। তখনই উনি ভবিষ্যৎবাণী শুনিয়েছিলেন যে, “ভারতীয় সিংহ’রা অবলুপ্তির জন্য অপেক্ষা করে আছে।’ সেই বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু, দিল্লিতে এসেই সমস্ত চিন্তাভাবনা ধাক্কা খেল। সিংহ’রা দিল্লি অর্থাৎ উত্তরে আগ্রাসন চালাল কেন? ওদিকে তো সমুদ্র নেই, নেই শুষ্ক বনাঞ্চল! উত্তর ভারতের(হিমালয় পাদদেশে অবস্থানের দরুন) প্রায় সব বনাঞ্চলি ঘন চিরসবুজ। যা সিংহদের একেবারেই প্রিয় আবাসস্থল নয়। তবে এখানে একটাই যুক্তি উঠে আসতে পারে, যা হল তৎকালীন সময়ে ভারতে সিংহ’দের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে পছন্দসই জায়গায় স্থান সঙ্কুলান হচ্ছিল না। পরিস্থিতির চাপে ভিন্ন ধরনের বনভূমিতে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিল তারা। ইতিমধ্যে ব্রিটিশরা উন্নয়নের হিড়িক তুলে দিয়েছে। ভারতীয়রা লোভায়িত হয়ে চাহিদা বাড়াতে থাকল। শুরু হল ব্যাপক বনধ্বংস, জনবসতি, রাস্তা, রেলপথ নির্মাণ। অতএব পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলতে হবে। নির্বিচারে সিংহ হত্যা শুরু হয়ে গেল।

অন্যদিকে, ঘন চিরসবুজ জঙ্গল বাঘেদের প্রিয় বাসভূমি। তারাই বা ছাড়বে কেন? বুদ্ধি এবং ক্ষিপ্রতায় সিংহ বাঘের সঙ্গে পেরে উঠল না। এলাকা দখলের লড়াইয়ে জয়ী হল বাঘ। এর কারণ পরিস্কার। সিংহ হল সাহসী, নিজেকে দৃশ্যমান করে রাখতে পছন্দ করে। বাঘ ঠিক তার উল্টো। চতুর, ধুরন্দর এবং চোরাগোপ্তা আক্রমণে বিশ্বাসী। অতএব সিংহ পেরে উঠবে কি করে? এই একইরকম চারিত্রিক বৈসাদৃশ্য দেখা যায় চিতা এবং লেপার্ডের মধ্যে। ফলত, চিতা ভারতবর্ষ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। লেপার্ড আজও টিকে আছে। যাইহোক, মানুষ এবং বাঘেদের সাঁড়াশি আক্রমণে।

সিংহের আসমুদ্র হিমাচলে সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন ভঙ্গ হল। একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ল সেই গুজরাটে। আজ গুজরাটের গির সংরক্ষিত বনাঞ্চল ভারতীয় সিংহদের একমাত্র ঠিকানা। গত শতাব্দীর শুরুতে মানুষের বাসভূমি নির্মাণ এবং প্রবল খরার দরুন গির-এ সিংহের সংখ্যা দ্রুত কমে এসে প্রায় বিলুপ্তির মুখে দাঁড়ায়। সিংহ’রা নিদারুন খাদ্যাভাবে মানুষ মারতে শুরু করে। মানুষও পাল্টা আক্রমণ চালায়। বেড়ে যায় মানুশ-সিংহ সংঘাত। ১৯১০ সালে গির-এ সিংহ সংখ্যা ২৪-এর নিচে নেমে গেছিল। যদিও সেই সময়ে সিংহ-সুমারি অনুযায়ী সংখ্যাটা ১০০-এর আশেপাশে ছিল। সেই সময়ে জুনাগড়ের নবাব সিংহ শিকার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেন। ফলে স্বাধীনতার সময় গির-এ সিংহর সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০০-তে দাঁড়ায়। এরপরই, সরকার সিংহ সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়। তখন সরকার নবাবের সংরক্ষণ নীতিকে বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এরও পরে ভারত সরকার ওই ১০০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলকে গির সংরক্ষিত বনাঞ্চল বলে ঘোষণা করে। ১৯৬০-এ গির জাতীয় উদ্যান এবং ১৯৭০-এ গির সিংহ অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। যদিও এইসব ব্যবস্থা ভারতীয় সিংহদের অবলুপ্তির হাত থেকে আদেও বাঁচাতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে হয়ত কয়েক শতক পিছিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। ওই ছোট্ট বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় এরা পারিবারিক প্রজননে লিপ্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে, ‘জিন-ফ্লো’ ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এদের বংশবিস্তারের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে বা আংশিক লোপ পেলেও অবাক হব না। যদিও, আঞ্চলিক হয়ে পড়ার এই সমস্যার থেকে আরও মারাত্মক হয়ে উঠেছে জনস্ফীতির চাপ। গির মুলত সিংহ অভয়ারণ্য হলেও ‘মালধারি’ নামে এক জনজাতি সেখানে রয়ে গেছে। এরা মূলত মেষপালক। পরম্পরাগতভাবে এদের গ্রামগুলো ওই সংরক্ষিত অঞ্চলের মধ্যে রয়ে গেছে। ফলে প্রায় ৮০০০ মানুষ এবং ১৫০০০ গবাদি পশুর অতিরিক্ত চাপ অভয়ারণ্যকে সয়ে যেতে হচ্ছে। সিংহ’রাও সহজ শিকার ধরার (গবাদি পশু) লোভে মালধারিদের গ্রামে হানাদারি চালায়। গ্রামবাসীরাও নানান উপায়ে তাদের মেরে ফেলার অঙ্ক কষে। ফলে মানুশ-পশু সংঘাত মারাত্মক আকার ধারণ করছে গির সংলগ্ন গ্রামগুলোতে।

২০০৭ সালের দুর্গাপূজার মহানবমী তিথিতে আমি এই বিষয়ে কাজ শুরু করি। তার নেপথ্যে একটা কারণ আছে। পাঠকদের আগে জানায়নি। এখন বলছি। ওইদিন সকালের খবরের কাগজ খুলেই স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম। খবরে প্রকাশ, তার দিন কয়েক আগে গির সংলগ্ন আমরেলি জেলার ধারি তালুকে প্রেমপদ গ্রাম। সেখানে এক তুলাচাষী দুর্লভজি বরদৌলাইয়া সিংহ’র থাবা থেকে তাঁর গবাদি পশুদের বাঁচাতে রাতে খামারের চারপাশে বিদ্যুৎবাহী তারের বেড়া দিয়ে রেখেছিলেন। সেই রাতেই বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা যায় ৩টি সিংহী এবং ২ টি শাবক। দুর্লভজি খুবই বুদ্ধিমান। পরদিন সকালে উঠে, এই ঘটনা চাক্ষুষ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি চুপিসারে সবকটি সিংহকে খবর দেন এবং তার ওপর প্রচুর সার চাপা দিয়ে দেন। যাতে প্রশাসন এবং গ্রামবাসীরা টের না পায়। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন ১৯৭২ অনুযায়ী দুর্লভজির সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাবাস হতে পারে কিন্তু পাঁচ পাঁচটি সিংহের জীবন? এতেই শেষ নয়। খবরে আরও প্রকাশ, সেই বছরেই গির-এ ৩২ টি সিংহের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৮ টি চোরাশিকারের বলি, ৬ টি সিংহ মারা গেছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, ১ টি গাড়ির ধাক্কায় এবং বাকি ১২ টি অঞ্জাত কারনে! সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে গির সংরক্ষিত অঞ্চলে সিংহের সংখ্যা ৩০০’র আশপাশে। তার মধ্যে এক বছরে মারা গেল ৩২ টি। অতএব আর কতদিন?

এদিকে অভয়ারন্যের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে ৩ টি বড় রাস্তা এবং একটি ট্রেনলাইন। যদিও বর্তমানে নাকি ৩ টি হাইওয়ে রাতে বন্ধ রাখা হচ্ছে। তবে যাত্রী এবং রাজনৈতিক চাপে এই ব্যবস্থা বেশিদিন টিকবে বলে মনে হয় না। এইসব নানান আর্থ-সামাজিক সমস্যার সঙ্গে রয়েছে ধর্মীয় সমস্যা। গির অভয়ারণ্য মধ্যস্থ অঞ্চলে চার-চারটি মন্দির রয়েছে। ভ যেখানে ফি-বছর প্রায় এক লক্ষ পুণ্যার্থি আসেন। তাদের পরিত্যক্ত নানান বর্জ্য এবং জ্বালানি কাঠের সংগ্রহ পশুরাজের বাসভূমিকে ক্রমে ধ্বংস করে চলেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিশ্বায়ন এবং বাজার অর্থনীতির যে নেতিবাচক প্রভাব প্রকৃতি তথা বন্যপ্রাণীদের ওপর আছরে পড়ছে, পশুরাজও তার আকস্মিক ধাক্কা থেকে মুক্ত নয়। এশীয় সিংহ পরিচিতি থেকে ভারতীয় সিংহ হয়ে গুজরাট ছুঁয়ে কেবলমাত্র গির সিংহ-তে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তারা। যে কোন একটা মাঝারি মাপের প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা মহামারি মুছে দিতে পারে তাদের শেষ ঠিকানা।

আশার কথা এই যে দেরিতে হলেও ভারত সরকার এদের টিকিয়ে রাখতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তৈরি হয়েছে সংরক্ষণ ট্রাষ্ট। এগিয়ে এসেছে ওয়াইল্ড লাইফ ইন্সটিটিউত অফ ইন্ডিয়া। ভারতীয় সিংহদের দ্বিতীয় একটা ঠিকানা দিতে বেছে নেওয়া হয়েছিল মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রের কাছে কুনো-পালপুর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যকে। যার মূল (কোর) অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৩৪৫ বর্গকিমি। এছাড়াও রয়েছে প্রায় ৯০০ বর্গকিমি ‘বাফার এরিয়া’। কুনোর নদী তীরবর্তী বাসভূমি, ঘাস-গুল্ম জঙ্গল, বিক্ষিপ্ত গহনতা, ছোট ছোট টিলা এবং বিস্তীর্ণ অব্যহার্য কৃষিক্ষেত্র বাসভূমি হিসাবে সিংহদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলেই এক সময় মনে করা হয়েছিল।

কিন্তু এতবড় একটা কর্মকান্ডকে বাস্তবায়িত করাও সহজ কথা নয়। এখানেও মারাত্মক সমস্যা। কুনো সংরক্ষিত এলাকার মধ্যেই ছিল ২৪ টি গ্রাম এবং প্রায় ১৫০০ গ্রামবাসী। এরা মূলত বনজীবী সাহরীয়রা আদিবাসী গোষ্ঠী। পরম্পরাগত জীবনধারা থেকে বঞ্চিত করে সরকার এদের পুনর্বাসন দিয়েছে সংরক্ষিত অঞ্চলের বাইরে। সঙ্গে খানিক প্রলোভনও ছিল। তাৎক্ষণিকভাবে তারা নিমরাজি হয়ে মেনে নিলেও ক্রমে তা বিক্ষোভের আকার ধারণ করেছে। রাতারাতি কোনো পরিবর্তিত জীবনধারা মেনে নেওয়া, রপ্ত করে ফেলা কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়। আন্দামানের ওঙ্গি, গ্রেট আন্দামানজি, জারোয়া কিংবা সম্পেনদের ক্ষেত্রেও সরকার একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। অবশেষে জারোয়া, সম্পেন এবং সেন্টিনাল-দের ক্ষেত্রে সরকার বাধ্য হয়েছে পিছু হটতে। কুনোর ক্ষেত্রেও সেই অভিঞ্জতাকে কাজে লাগানো উচিৎ ছিল। এই সাহরীয়’রা না জানে চাষ-আবাদ করতে, না জানে পাথর ভাঙতে। অতএব যতই তাদের আস্তানা দেওয়া হোক-তারা কাজ কি করবে? খাবে কি? জঙ্গলের ওই ছায়া সুনিবিড় নিঝুমতা ছেড়ে তারা কি পারবে এই শুষ্ক, পাথুরে প্রান্তরে জীবন কাটাতে? এইসব আগে ভাবা উচিৎ ছিল না? আজ বিক্ষোভের আগুন যতই বাড়ছে সরকার টাকার বরাদ্দ বাড়িয়ে তাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। জানি না এই ব্যবস্থা আদেওদ কার্যকরি হবে কিনা। অশিক্ষিত গরিব-গুর্বোরা ন্যায়-নীতি, আইন আদালত হয়ত জানে না। কিন্তু এ তো তাদের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ। এক্ষেত্রে সরকারের উচিৎ ছিল দৃষ্টিভঙ্গি বদলে মানুশ-পশু সহাবস্থানের কথা চিন্তা করা। সারা পৃথিবী কেন, ভারতেও এরকম প্রচুর দৃষ্টান্ত আছে।

পরিশেষে ভুললে চলবে না, মানুষ প্রকৃতিরই অঙ্গ। তথাকথিত ‘ফরেস্ট ইকোসিস্তেম’-এরও একটা অংশ। আর বনবাসী মানুষকে ‘স্যাসটেনেবল ইউজ’-এর কথাও শেখাতে হয় না। ওটা ওদের সহজাত জ্ঞান। সমস্যা সৃষ্টি করি আমরা, বহিরাগতরা। কী হত কুনোতে মানুষ-সিংহ একসঙ্গে থাকলে? কেন গির-এ নেই? ভারতের অন্যান্য ব্যাঘ্র প্রকল্পে নেই? সাহরীয়াদের ছোট ছোট গ্রামগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা খানিকটা বাড়িয়ে দিলেই হত। এত বড় কর্মকান্ড করে কোটি কোটি টাকা খরচ করার কি কোন প্রয়োজন ছিল? পরীক্ষামূলকভাবেও তো কিছুদিন দেখা যেতে পারত!

এহেন অনভিপ্রেত ঘটনা নিয়ে ভারত তথা মধ্যপ্রদেশ সরকার যখন জেরবার হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই আরও বড় ধাক্ক এল গুজরাট সরকারের কাছ থেকে। তারা গির-এর সিংহ কুনোতে দিতে নারাজ। খোদ ভারত সরকারও এঁটে উঠছে না তাদের সঙ্গে। আসলে মূল কারণ অর্থনৈতিক। ফি-বছর কয়েক লক্ষ পর্যটক আসেন গির-এ। কারণ তা এশীয় সিংহদের একমাত্র ঠিকানা। এই একছত্র অধিকার কি কেউ সহজে ছেড়ে দেয়? এসব আগে ভাবা উচিৎ ছিল না? কাদের দিয়ে এত বড় বড় ‘প্রজেক্ট রিপোর্ট’ বানানো হয়? শ্রদ্ধা রেখেই বলতে বাধ্য হচ্ছি, বলিহারি তাদের অভিঞ্জতা! এখন তো আবার শুনছি, মান বাঁচাতে কুনোতে সিংহ’র পরিবর্তে শিকারি চিতা ছাড়া হবে! আফ্রিকা এবং ইরান থেকে সেইসব চিতা আনা হবে। যা কিনা ৬০-এর দশকেই ভারত থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আর চিতা যদি ছাড়াও হয়, তার সঙ্গে সিংহ’র বিরোধ কোথায়? আফ্রিকার অনেক জায়গায় সিংহ-চিতা সহাবস্থান করছে। এখানেও না হয় করত! কিন্তু না, তা করবে না।

আসলে এই সবই হল ‘হিপোক্রেসি’র মোড়কে কায়েমি স্বার্থসিদ্ধির চিরাচরিত প্রথা। জানি না কুনোর ভবিষ্যত কী? ভবিষ্যত কি সাহরীয়াদের? আর পশুরাজ সিংহ? সে তো ইতিহাসে মহাশক্তির প্রতীক, দেবী দুর্গার বাহন। কিন্তু, বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়! তাদের ভবিষ্যত কি, তা একমাত্র সময়ই বলতে পারবে। কিংবা কোনও অধিবাস্তবতা তাদের কোনক্রমে টিকিয়ে রাখবে। রাখতেই হবে। কারণ, সিংহ না থাকলে অসুর নিধন করবে কে?