Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

দুরন্ত বাস্তব
১৫০০ টাকায় ‘সাত-পেট’ ভরাতে পারছে না নর্মদা

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান, বালির দুনিয়া, সুন্দরবনঃ মাতলা নদী ধরে সুন্দরবনের ধূলিভাসানি অর‍ণ্যের বুক চিরে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছিল বোট’টা। জঙ্গলের ৩নং কম্পার্টমেন্ট শুরু হতেই একটা ছোট্ট ডিঙি নৌকা চোখে পড়ল। জঙ্গলের একদম গায়ে নৌকা ভিড়িয়ে শাক-পাতা সেদ্ধ করছিল নর্মদা দাস। বছর পঁয়তাল্লিশের শীর্ণকায় মহিলা। সঙ্গী বলতে তার বড়ো ছেলে হরিপদ। বাড়ি অম্বিকানগর। দু’ রাত্রির পেরিয়ে গেছে। ঘরে ফেরা হয়নি। কাঁকড়ার খোঁজে ভয়াল বাদাবনে খাঁড়ির আনাচ-কানাচে ছান মারছে। হরিপদ’র বয়স বড়োজোর ৩০ হবে। ওর বাবা ভূপতি দাসকে জলে-জঙ্গলে সংগ্রাম করতে করতে অকাল-বার্ধক্যে পৌঁছেছে। “তার শরীলে ইত ধকল আর সয়নিকো”- নর্মদা বলল। তাই স্বামীর কষ্ট লাঘব করতে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ‘জলে’ নেমেছে শীর্ণকায় নর্মদা! শাক-পাতার পুষ্টিতে মুহুর্মুহু হাল টানতে কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে তার। মাত্র পঁয়তাল্লিশেই স্তনযুগল শুকিয়ে পাঁজরের সঙ্গে মিশে গেছে। ওফ্! কি ভয়াবহ দারিদ্র, অপুষ্টি! আর ঠিক তার উল্টোদিকে উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ! কিন্তু তা বললে কি হবে? পেট মানবে কেন? তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে পার করেছে। এখনও সংসারে তারা দু’জন, ছেলে, ছেলের বউ এবং তাদের নাতি-নাতনি। সাত জনের পেট চালানো কি মুখের কথা? তবুও ক্লান্ত স্বামি ভূপতিকে আর জলে নামতে দেয় না। দু’দিনে সাকুল্যে ২কেজি কাঁকড়া পেয়েছে। তাও ছোট ছোট। বড়জোড় ২৫০/৩০০ টাকায় বিকোবে। হরিপদ বলল, “গেল অমাবস্যায় পশ্চিম পাড়ে ১৫ কেজি পাইছিলাম”। তাকে থামিয়ে নর্মদা বলল, “তা হইলে হবে কি, বছরের গড়ে মাসে ১৫০০/১৬০০ টাকা আয় হয়গা”।

হ্যাঁ, সুন্দরবনের আশপাশে চার-পাঁচশো জেলে পরিবারে গর মাসিক আয় ১৫০০/২০০০ তাকার বেশী নয়। “ইতে কইরে কী সাত খান পেট ভরেগা?”না নর্মদা, ভরেনা। ওকে বলিনি। শুধু ভেবেছিলাম। আমরা তথাকথিত সভ্য সমাজের প্রতিনিধি। থমকে গিয়ে ধমকে বললাম-“অ্যাই চোপ। সত্যি কথা বলে যে অনাহারে মরে সে।” আমার কথার ইঙ্গিত বুঝে গিয়ে হরিপদ তার মাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “থামো দিকিনি। জলের প্রাণী মারছ মারো-মরছ মরো। ইনাদের বইল্যা কি হইবে!”

বেশী কথা বলি কি লাভ? প্রকৃ্তিকে প্রহমান কাল ধরে শুষে নিতে নিতে কৃপণ হয়ে গেছে। সুন্দরবনের জলে আজকাল মাছ, কাঁকড়া কিছুই আর মেলে না ভাল। তার ওপ দিনপ্রতি সরকারের গুনে গুনে পয়সা দিতে হয়। হ্যাঁ, আয়ে হোক বা না হোক, ‘গভরমেন্ট রেভিনিউ’ ফাঁকি দেওয়া চলবে না! বাদাবনের জল-জঙ্গলে রসদ কমছে। ভাগীদার বাড়ছে। কি আর করা যাবে? রাজনীতিকরা বলেছেন, ওদের উন্নত করে দেবেন। মূলস্রোত, সভ্যতার সঙ্গে মিশিয়ে দেবেন। উত্তম-চিন্তা। স্বপ্ন! কিন্তু করছেন না। একে একে অর্ধাহারি নর্মদা’দের অকালে দেহরস শুকিয়ে যাবে। নিঃশব্দে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে তারা। হয়ত যৌবনের শুরু কিংবা মধ্যভাগে! ওরা কখনই মুখ ফুতে বলতে পারবে না-“ ডু ইট নাও। দ্যএন ওনলি উই উইল গিভ ইট ভোট, ইন রির্টান।”