Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

“আল্লার সঙ্গে পাল্লা নয়”
আরও বিপন্ন খেঁকশিয়ালের খবর নেই

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান, কলকাতাঃ দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সভাল অঞ্চলে ভ্যান দেম ম্যারি একটি গুরুত্বপূর্ন অনুসন্ধান চালান। ১৯৫৩ সালে মারভে সেখানকার কালো পিঠের শিয়ালদের নিয়ে বইটি লিখেছিলেন। অসংখ্য কৃষকের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছিলেন যে অতীতে শিয়া লরা খামারের হাঁস-মুরগি খেত না। বনের খাবারেই অভ্যস্থ ছিল। বন- জঙ্গল তখন অনেক বেশি ছিল। এরপর বন এবং বনের ছোট প্রাণী কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে শিয়ালরা গেরস্থের খামারে হানাদারি শুরু করল। তখন শিয়ালদের উপদ্রবে মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের নিধন করতে শুরু করল। তারা আশেপাশে যত শিয়াল পেল, তাদের শেষ করল। সাময়িকভাবে শিয়ালের উপদ্রব থেকে রক্ষা পেল ঠিকই, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে সেই সমস্যা আরও গুরুতর আকার ধারণ করল। প্রশ্ন। কিভাবে? এর উত্তর বড় ভয়ানক! মানুষ যে শিয়ালদের মেরেছিল তারা সবকটিই ছিল গ্রামের আশেপাশের শিয়াল। জঙ্গলের নয়। গেরস্থের হাঁস, মুরগি খেয়েই এরা অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিল। যা খুবই সহজ শিকার। এই শিকার পেতে নিয়মিত বুদ্ধির চর্চা করতে হত না এবং বংশ-পরস্পরায় এই ধারা অব্যাহত থাকতে থাকতে এই শিয়ালদের বুদ্ধিও ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। এরা মানুষকে আধা-বন্ধু বানিয়ে ফেলেছিল। এর ফলে রাতারাতি তাদের শেষ হতে হয়েছিল। কিন্তু মানুষ ততোধিক বোকা। অন্তত প্রাকৃতিক ব্যাপার-স্যাপারে। তারা তখন এটা ভাবতে পারেনি কেবল বোকা শিয়ালগুলোই মরছে। বুদ্ধিমান শিয়াল গুলো কিন্তু জঙ্গলেই রয়ে গেল। তাদের থেকে পরবর্তী সময়ে আরও তীক্ষ্ণবুদ্ধির শেয়াল জন্ম নিতে থাকল। এরা আর গেরস্তের হাঁস-মুরগিতে সীমাবদ্ধ থাকল না। ব্যাপক হারে ভেড়া, ছাগল মারতে থাকল। অথচ, মানুষের বসতির ধারেকাছেও তারা থাকত না, যে আবার মেরে ফেলা যাবে। তাদের টিকিটিও ধরা গেল না। গ্রামীণ পশুপালন ব্যবসায় ধস নেমে এল! এখানে আবার সেই বন্ধুর কথা মনে পড়ছে। “আল্লার সঙ্গে পাল্লা দিও না।”

এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। সোনালি শিয়ালের (পাতি শিয়াল) মত খেঁকশিয়ালও পাকিস্থান, নেপাল, ভারত এবং বাংলাদেশের অন্য একটি কুকুর-বংশীয় প্রজাতি। আকারে এরা শিয়ালদের থেকে অনেকটাই ছোট। ওজন মাত্র ২-৪ কেজি। কিন্তু আকৃতি এবং আচরণগত দিক থেকে ছোট শিয়ালই বলা চলে। এর বৈঞ্জানিক নাম হল ভালপে্স বেঙ্গালেনসিস, বংশ ক্যানিদি, গণ ভালপিনি, বর্গ কারনিভোরা। ভারতে খেঁকশিয়ালদের ৪ টি প্রজাতি (উপপ্রজাতি নয়) দেখা যায়।

১)ভারতীয় খেঁকশিয়াল (ইন্ডিয়ান ফকস-ভালপে্স বেঙ্গালেনসিস), ভারতের প্রায় সর্বত্রই এদের দেখা যায়।

২)ব্লানফোর্ড খেঁকশিয়াল (কমন রেড ফকস-ভালপে্স ক্যানা), পাকিস্থান, আফগানিস্থান লাগোয়া উত্তর-পশ্চিম ভারতের সামান্য অংশ।

৩)তিব্বতী খেঁকশিয়াল (টিবেটিয়ান ফকস-ভালপে্স ফ্যারিলাটা), ভারতের লাদাখ-কাশ্মীর অঞ্চল।

৪)সাধারণ লাল খেঁকশিয়াল (কমন রেড ফকস্-ভালপে্স ভালপে্স), কেবলমাত্র উত্তর-পশ্চিম ভারত।

বাস্তুতন্ত্রে শিয়াল এবং খেঁকশিয়ালদের অপরিসীম গুরুত্ব আছে। এরা দ্রুত বংশবিস্তারকারী ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে (যা বড় শিকারি প্রাণীরা মারে না) প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখে। তুচ্ছতি তুচ্ছ শিকার ধরে বলেই বিবর্তনের মাধ্যমে এদের বুদ্ধিও অতি সূক্ষ্ণ। মোটা দাগের বুদ্ধি নিয়ে ছোট শিকার ধরা সহজ কথা নয়। তাছাড়াও এদের সংস্পর্শে মানুষের ক্ষতি প্রায় নগণ্য। বড়জোর মাঝেমধ্যে দু-একটি মুরগির ছানা কিংবা ক্ষেতের ফলমূল। এই প্রসঙ্গে সেই মূল্যবান তথ্যটি মনে পড়ছে। যা লেখার শুরুতেই আলোচনা করেছি। শুধু শিয়াল নয়, প্রকৃতির সমস্ত ব্যাপারেই এই উক্তি ধ্রুব সত্য। তা সে পিঁপড়ে, গাছ, হাতি-যাইহোক না কেন। আমরা বুঝেছি না মানেই যে প্রকৃতিতে সেই প্রাণীটির কোন প্রয়োজনীয়তা নেই, এমনটা নয়। বরং কোন নির্দ্দিষ্ট প্রজাতির প্রয়োজন ফুরালে, প্রকৃতি নিজেই তাকে সরিয়ে নেবে। আমাদের অনধিকার চর্চা না করাই ভাল। এতে হিতে বিপরীত হবে।

এবার খেঁকশিয়ালদের কথায় আসা যাক। এদের শরীরের দৈর্ঘ্যে এবং কাঁধের উচ্চতা প্রায় সমান। দেড় থেকে পৌনে দুই ফুট। প্রাণীবিশেষে বড়জোর দু-ফুট। এদের ঝালরের মত লেজটি প্রায় সমদৈর্ঘ্যের। দেহ অনেকটা চর্তুভূজ আকৃতির। তার মধ্যে মাথা এবং শরীরের অনুপাত প্রায় ৪০ঃ৬০। এদের আদর্শ বাসভূমি সাধারণ শিয়ালদের মত। তবে সাধারণ শিয়াল এবং খেঁকশিয়াল এক জায়গায় থাকে না। কারণ সাধারণ শিয়াল এদের মেরে খেয়ে ফেলে। জঙ্গলে খেঁকশিয়ালদের দেখা মেলা ভার। কারণ সেখানে শিয়াল তো আছেই। তাছাড়াও একাধিক শিকারি প্রাণীর ভিড় থাকে। অতএব, এদের বাসভূমি খুবই সীমিত। মানুষের বাসভূমির আশেপাশে যেখানে শিয়াল ঢোকে, প্রথমেই খেঁকশিয়ালদের শেষ করে দেয়। তার ওপর মানুষের উপদ্রব, বাসভূমি ধ্বংস প্রভৃতি তো রয়েইছে। এখানে মনে রাখতে হবে, খেঁকশিয়াল কিন্তু সাধারণ শিয়ালদের মত একবাসা বা ডেরার প্রাণী নয়। শিয়ালদের চোখে ধুলো দিয়ে এদের বাচ্চা বড় করতে হয়। এই কারণে এরা একাধিক বাসা (গর্ত) ব্যবহার করে। একসময়ে গ্রামের মাঠঘাটে অসংখ্য গর্ত দেখা যেত। বেশিরভাগই খেঁকশিয়ালের বাসা। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে অসংখ্য খেঁকশিয়াল আছে। আদপে তা নয়। একটি স্ত্রী-খেঁকশিয়াল বাচ্চা মুখে করে এবাসা-ওবাসা করে, স্বাভাবিক নিরাপত্তার কারণে। কিন্তু সেই জায়গা আজ আর ভারতে অবশিষ্ট নেই। সেবার একটা কাজে নবদ্বীপ গিয়েছিলাম। সকালে বাগানে ঘুরতে গিয়ে দেখি একটা খেঁকশিয়ালের গর্তে মুখ ঢুকিয়ে আছে ফুট পাঁচেকের লম্বা ময়াল সাপ! অসহায় মা-খেঁকশিয়াল আমার উপস্থিতি উপেক্ষা করে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে ছটফট করছিল। ছুটে গিয়ে লেজ ধরে টেনে সাপটাকে গর্ত থেকে বার করলাম। যা ভাবা ঠিক তাই। মুখে খেঁকশিয়ালের ছানা। তখনও গেলা শুরু করেনি। ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম না। কারণ বেচারি আগেই মারা গেছিল। অতএব এত শত্রুর চোখ এড়িয়ে বাচ্চা প্রতিপালন করা যে কঠিন কাজ, তা খেঁকশিয়ালই জানে। এর ওপর মানুষের লোভ তো রয়েছেই। এদের চামড়া দিয়ে কি ছাইভস্ম ওষুধ তৈরি হয়! কুসংস্কার, বুজরুকি। কোন কোন জায়গায় নাকি এদের মাংস খাওয়ারও প্রচলন আছে বলে শুনেছি। এইসব কারণে একসময় যথেচ্ছ হারে খেঁকশিয়াল মারা হয়েছে।

খেঁকশিয়ালরা আবার শিয়ালদের মত দিনে বেরোয় না। সারাদিন গর্তের ভেতরে ঘুমাতে থাকে। সন্ধের ঠিক আগে আগে গর্ত থেকে বেরিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে গঙ্গাফড়িং, মাকড়সা, পোকা, ইঁদুর ধরে খায়। কেউ কেউ আবার খেঁকশিয়ালদের উইপোকার ঢিপি ভেঙে বনরুইদের মত উই খেতে দেখেছেন। খরগোশের ছানা, পাখি, পাখির ডিম, মাছ, গিরগিটি, নির্বিষ সাপ (জলঢোড়া, ঘরচিতি, হেলে ইত্যাদি) সবই এদের খাবারের তালিকায় রয়েছে। পাকা আম, কাঁঠাল, তরমুজ, ফুটি, কলা, আঙুর এসবও সমানতালে চলতে থাকে। রাতের বেলা গ্রাম্য বাড়ির খাটা-পায়খানাও পরিস্কার করে দিয়ে যায়। এদের মধ্যে ‘ব্লানর্ফোড’ প্রজাতিটি আবার তড়তড়িয়ে গাছে উঠে পড়ে। ফলে কাঠবিড়ালি এবং গেছো ইঁদুর, ছুছদের সংখ্যাও নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে শিয়ালদের মত এদের বড় একটা জোড়ায় জোড়ায় শিকার ধরতে দেখা যায় না। ছোট শিকার। তাই একাই একশো। যে যার, সে তার। তবে মা-শেয়ালের অতিরিক্ত দায়িত্ব-তার ছানাপোনা। তবে খেঁকশিয়ালের সব প্রজাতি কিন্তু থাকে জোড়ায় জোড়ায়। তিব্বতিগুলো আবার দলে থাকে। শিকারও ধরে।

সাধারণত খেঁকশিয়াল ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে সন্তান প্রসব করে ২-৪ টি। যদি বাঁচল তো ৩/৪ সপ্তাহের মধ্যে বাসার আশেপাশে ছোটাছুটি করে খেলা করতে থাকে। ওই কদিনের মধ্যে বেশ শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে। তিব্বতী প্রজাতি বাচ্চা দেয় আরও পরে। এপ্রিল-মে মাসে।‘ব্লানফো র্ড’ প্রজাতি অক্টোবর-নভেম্বরে। প্রাপ্তবয়স্ক তিব্বতী শিয়াল আবার আকারে অপেক্ষাকৃত বড়। প্রায় কেজি চারেকের হয়। ‘ব্লানফোর্ড’ খুব ছোট। শুনেছি দেড় থেকে দু’কেজি ওজন হয়। প্রায় বেড়াল আর কি!

যাইহোক, ক্ষেতের পোকামাকড় খেয়ে এরা যে আমাদের কত উপকার করে, তা মানুষ জেনেও জানেনি! ফলে খেঁকশিয়াল বহুবছর ধরেই অবলুপ্তির পথে। বনমন্ত্রক এদের সংরক্ষণের চেষ্টা করছে ঠিকই। কিন্তু মনে হয় পারবে না! আর কয়েক দশকের মধ্যেই খেঁকশিয়াল শেষ হয়ে যাবে। আমরা গম্ভীরভাবে বলব ‘স্পিসিস লাইফ’ শেষ হয়ে গেছে!