Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

ভূতগাছ নয়, উপকারি বন্ধু
ছাতা দিয়ে বাংলার মাথা রক্ষা করুক রাজ্যবৃক্ষ ছাতিম

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান, কলকাতাঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বৃক্ষের নাম কি? আমি হলফ করে বলতে পারি শতকরা ৯৯ শতাংশ মানুষই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না। কারণ, প্রকৃতির বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণী প্রজাতিদের বিষয়ে আমরা বড়ই উদাসীন! তাদের চেনা কিংবা তাদের সম্বন্ধে জানার সময়ও নেই। ব্যস্ততর জীবনে আশপাশের উপকারি বন্ধুদের উপেক্ষা করে চলাটাই অধুনা সমাজের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে যাই হোক, উত্তরটা বলেই দিই। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বৃক্ষের নাম ছাতিম। বৈজ্ঞানিক নাম ‘এ্য এ্যালস্টোনিয়া স্কোলারিস’।

দুই বাংলাতেই তা ছাতিম নামে পরিচিত। বার্মিজ’রা বলেন, ‘লেটক’, ইন্দোনেশিয়ায় ‘পুলাই’ ফিলিপিন্স’ এ ‘ডিটা’ এবং জাভা দ্বীপে এরা আবার ‘পুলে’ নামে পরিচিত। মালয় দ্বীপে ‘পুলাই-লিনলিন’। নেপালে ‘ছ্যতিয়ান’। থাইল্যান্ডে ‘সাত্তাবান’ বা ‘টিনপেট’। ভিয়েতনামে ‘ক্যায়-মফ্-কুয়া’। কেরল, তামিলনাড়ু প্রভৃতি দক্ষিণের রাজ্যে এরা আবার ‘পালা’ নামে পরিচিত। সংস্কৃত ভাষায় আমরা বলি ‘সপ্তপর্ণী। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে ছাতিম কাঠের নাম ‘হোয়াইট-চিজ উড’ বা শ্বেত-নমনীয় কাঠ।

পাঠকদের মনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে, ছাতিম গাছের এত ভিন্ন নাম উল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তা কী? হ্যাঁ, এই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিশাল অঞ্চল জুড়ে ছাতিম গাছের বিস্তারকে বোঝানোর জন্য এতগুলো নামের অবতারণা করলাম। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বৃক্ষের বিস্তার ঘটেছে গোটা ভারত সহ ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, ণেপাল, বাংলাদেশ, বোর্ণিয়, নিউগিনি, ফিলিপিন্স, সোলেমন দ্বীপপুঞ্জ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এমনকি সুদূর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। যদিও নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, চীন দেশের কিছু রাজ্য সহ তাইওয়ান এবং মার্কিন মুলুকেও একসময় ছাতিম গাছের বিস্তার ঘটেছিল। যদিও এই কয়েকটি দেশে বর্তমানে তাদের উপস্থিতির কোন খবর পাওয়া যায় না।

অতীতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অরণ্য-পার্শ্বস্থ অঞ্চল এবং গ্রামগঞ্জে রাস্তার ধারে অসংখ্য ছাতিম গাছ দেখা যেত। এরপর নানান উন্নয়নমুলক কাজের প্রয়োজনে, বিশেষ করে রাস্তা চওড়া করার কারণে অসংখ্য গাছ কাটা পড়ে। সেই ধারা আজও অব্যাহত। আজ থেকে বছর ১৫-২০ আগেও রাস্তার ধারে যত গাছ কাটা পড়তে দেখতাম, তার মধ্যে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ গাছই ছিল ছাতিম। আরও পরে রাস্তা বরাবর বৃক্ষরোপণের যে হিড়িক শুরু হল, তাতে করে ছাতিম গাছ বিশেষ প্রাধান্য পেল না। তালিকার অনেক নিচে নেমে গেল। এর অন্যতম কারণ হল, এই গাছের অপেক্ষাকৃত ধীর বৃদ্ধি-হার। এক একটি পূর্ণবয়স্ক ছাতিম গাছ প্রায় ১০০-১৫০ ফুট উচ্চতা লাভ করে। কিন্তু ওই উচ্চতায় পৌঁছতে তাদের ৪০-৫০ বছর সময় লাগে। অতএব দেশ বিদেশের অসংখ্য দ্রুত বৃদ্ধি যোগ্য গাছ ছাতিমকে সরিয়ে বাংলার মাটিতে জনপ্রিয় হতে লাগল। তাছারাও ডালপালা ছড়িয়ে এক-একটি ছাতিম গাছ যে পরিধি নিয়ে বৃদ্ধি পায়, তাতে করে রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল তথা বিদুত্যৎ এবং টেলিফোন যোগাযোগেরও সমস্যা সৃষ্টি করে। অথচ সেই অনুপাতে ছাতিম কাঠের বাজারদর ততটা আর্কষণীয় নয়। দেশীয় বাজারে তা কেবলমাত্র প্যাকিং বাক্স, কফিন এবং কিছু হালকা আসবাবপত্র তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়।

তবে ছাতিম গাছের ছাল এবং বৃক্ষরস ওষুধ তৈরির কাজে আজও এক অপরিহার্য উপাদান। যতদূর জানা যায়, এই ছাতিম গাছের উপাদানগুলির মধ্যে বিভিন্ন এ্যাল্কালয়েডস, ফ্লাবোনয়েডস প্রভৃতির উপস্থিতি থাকায় ম্যালেরিয়া, এপিলেপ্সি, হাঁপানি, ডাইরিয়া, আলসার, বেরিবেরি এবং বিভিন্ন চর্মরোগ উপশমে ভীষণভাবে কার্যকরী হয়। অনেক ক্ষেত্রে ছাতিম গাছের ছাল কুইনাইন-এর বিকল্প হিসাবেও ব্যবহৃত হয়েছে। এমনও শোনা যায় যে, ছাতিম গাছের বৃক্ষরস নাকি ক্যানসার রোগেরও প্রতিষেধকের কাজ করে। প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও ছাতিম গাছের বহুল ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। অতএব, এতসব উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে ছাতিম গাছের বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে কমে আসছে। এর নানান আর্থ-সামাজিক কারণ নিয়ে আগেই আলোচনা করেছি।

উক্ত কারণ ছাড়াও ছাতিম গাছ রোপণের একটি ব্যবহারিক অসুবিধে রয়েছে। যা হল, এই গাছের বীজ সংগ্রহের সমস্যা। ছাতিম ফল সাধারণত গাছের ডগার দিকে অবস্থান করে এবং সেই ফল মাটিতে পড়ার আগেই তা ফেটে বীজগুলো খোলা অবস্থায় গাছের উপরে অবস্থান করতে থাকে। ফলে গাছের অত উঁচু অংশে গিয়ে বীজ সংগ্রহ করা খুবই দুরুহ কাজ। অন্যদিকে ঝড় এবং বাতাসের প্রভাবে তা বহুদূর-দুরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঝোপের মধ্যে থেকে সেই বীজকে সংগ্রহ করা খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। আর প্রাকৃতিক উপায়ে যেভাবে বীজগুলো ছড়িয়ে পড়ে তাতে করে অধিকাংশই কোন না কোন ঘন ঝোপ বা জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে পড়ে। অন্যদিকে প্রখর সুর্যালোক না পেলে সেই বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয় না। অথচ ছাতিম বীজের প্রস্ফুটন হার প্রায় ১০০ শতাংশ। কিন্তু শর্ত একটাই। উপযুক্ত পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোক। ফলে, কোন কোন জঙ্গলের মধ্যে ছাতিম গাছের ততটা বিস্তার দেখা যায় না, যতটা দেখা যায় জঙ্গল পার্শ্বস্থ উন্মুক্ত, খোলামেলা পরিবেশে। সুতরাং সুপরিকল্পিতভাবে ছাতিম চারা রোপণ এবং তার পরিচর্যা ছাড়া এই গাছের বিস্তার ঘটানো বেশ অসুবিধাজনক কাজ।

এ তো গেল ছাতিম গাছের নানান সুবিধে-অসুবিধের দিক। এতে করে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠল তা হল, গুরুত্ব বিচারে যে ভাবেই হোক না কেন আমাদের রাজ্যে ছাতিম গাছের বিস্তার ঘটাতেই হবে এবং তা সুসংগঠিত বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে। অতএব কালবিলম্ব না করে এই বিষয়ে উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও এই গাছের উপযোগিতার বিষয়ে আরও সচেতন করে তুলতে হবে।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই বিশালদেহী বৃক্ষটিকে এখনও বহু জায়গায় ‘ভূত গাছ’ বলে বিবেচনা করা হয়। নানান ভয় এবং কুসংস্কারজনিত কারণে স্থানীয় স্থানীয় মানুষ ছাতিম গাছ কাটলেই কেটে ফেলেন। খুব সম্ভবত বড়বড় শাখা-প্রশাখা থাকার জন্য এবং অপেক্ষাকৃত নমনীয় কান্ডের দরুন সামান্য ঝড়বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেই ছাতিম গাছের বড় বড় শাখা ভেঙে পড়ে। অথচ সেই একই দুর্যোগে আশপাশের গাছেরা বলিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে থাকে (শক্ত কান্ডের কারণে)। এর থেকেই হয়ত ভূত নামে অদৃশ্য অশরীরী আত্মার ভয় মানুষের মনে দানা বেঁধেছিল। সেই ভীতি পরম্পরাগত ভাবে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সংক্রামিত হয়ে আসছে। যার শিকার বেচারি ছাতিম গাছ।

জৈববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে, বাংলার প্রকৃতিতে ছাতিম গাছকে টিকিয়ে রাখা একান্ত প্রয়োজন। অন্যথায় ছাতিমের শূণ্যস্থান পূরণ করার মত কোনও বৃক্ষ নেই বললেই চলে। বট, অশ্বত্থের পাশাপাশি ছাতিম ছাড়া আর কোন বৃক্ষ ছাতা দিয়ে বাঙালির মাথা রক্ষা করবে?