Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

বাবুঘাটে বাদা উদ্ভিদ
চমকে দিল চাককেওড়া

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান, কলকাতাঃ ....হিথায়া তুকে মানাইছে বেশ রে...। কল্লোলিনী কলকাতার উপকন্ঠে বয়ে চলা হুগলি নদীর লবণাক্ততা প্রত্যক্ষ করতে ভেসে যাচ্ছিলাম উজানে। হঠাৎ চমক। বাবুঘাটের ধারে সেজে ওঠা মিলেনিয়াম পার্কের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। নৌকার মুখ ঘুরিয়ে সেখানে পৌঁছলাম। অবিশ্বাস্য! এ তো চাককেওড়া! নির্ভেজাল বাদা প্রজাতি। হ্যাঁ দেখেছি, সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে, দাড়িয়ে আছে ‘থরে থরে’। বৈজ্ঞানিক নাম, ‘সুনারেসিয়া ক্যাসিওলারিস’। ভারতের সমস্ত বাদাবনেই এদের উপস্থিতি আছে। বানর এবং স্থানীয় মানুষকেও ওই কেওড়া ফল মহানন্দে খেতে দেখেছি। হ্যাঁ, জ্বালানির পাশাপাশি চাককেওড়ার কাঠ দিয়ে হালকা-পাতলা আসবাবপত্র তৈরি হয়। দেখতে দেখতে আরও তিনটি গাছ চোখে পড়ল। ইতস্তত ছড়িয়ে আছে ওরা। স্থানীয় মানুষ বললেন, “মোট ছ’টা ছিল। পার্ক তৈরির সময় (মিলেনিয়াম) দু’টো কেটে ফেলা হয়েছিল। এখন আছে চারটি।

কিন্তু এই গাছ হয় বাদাবনের লবণাক্ত জলে! সে বাবুঘাটে উঠে এল কিভাবে? তাহলে কি সমুদ্রের ‘ব্যাক ওয়াটার’ মাঝে মাঝে ওপরের দিকে উঠে আসে? যাতে করে ভেসে আসে নানান বাদা-বীজ। আর ওপরের দিকে অর্থাৎ নদীর জলে লবণাক্ততা না থাকায় বেশিরভাগ বাদা-বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয় না। টিকে যায় কেবল চাককেওড়া? কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরও বিস্মৃত হলাম। না, কেবল নোনা জলই নয়, মিষ্টি জলপ্রবাহের ধারেও সমান সাবলীল এই চাককেওড়া। সাধারণত সুন্দরবনের বিভিন্ন খাঁড়ির ধারে এদের বিস্তার দেখা যায়। যদিও এরা প্রথম সারির বাদা উদ্ভিদ বা ‘ট্রু-ম্যানগ্রোভ’ নয়। বরং দ্বিতীয় সারি কিংবা ‘ব্যাক ম্যানগ্রোভ’ হিসাবেই পরিচিত। যতদূর জানা যাচ্ছে, ১৮৯৭ সালে প্রথম এই প্রজাতিটি নথিভুক্ত হয়। বেশিরভাগ বাদা উদ্ভিদের আকৃতি হয় ছোট। ফলে জ্বালানি কাঠ ছাড়া গুণগত মান বিচারে বাদা উদ্ভিদের ততটা কদর নেই। ব্যতিক্রম এই চাককেওড়া। উচ্চতায় প্রায় ৩০ ফুট হতে পারে। কান্ডের পরিধি ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত নথিভুক্ত হয়েছে।

সুতরাং, কেওড়া ফলের বাস্তুতান্ত্রিক খাদ্যগুণ, পাতা, বৃক্ষরস এবং শিকড়ের ঔষধিগুণ ছাড়াও কাঠের গুণগত মান বিচারে এই বাদা প্রজাতিটি অবহেলিত বলেই আমার মনে হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন নদী, উপনদী বা শাখানদীর দু’পাড়ে চাককেওড়া রোপণ করতে অসুবিধা কোথায়? কেন আমরা বিভিন্ন বিদেশী প্রজাতির গাছের দিকে তাকিয়ে থাকব? কেন অবহেলিত হবে আমাদের দেশীয় প্রজাতির গাছ? যা রোপণ এবং পরিচর্চার খরচ অনেক কম। একবার লাগিয়ে দিলেই হল। প্রাকৃতিক নিয়মেই চাককেওড়ার বিস্তার হয়। ‘ফ্লাইং-ফকস’ (বাদুড়) এবং জোনাকি পোকারা এদের পরাগ মিলন ঘটিয়ে দেয়। সুতরাং বনকর্তাদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, রাজ্যের নদী তীরবর্তী পতিত জমিতে বনসৃজন করতে (ওয়েস্টল্যান্ড ডে্ভালপমেন্ট) আপনাদের আর বৃক্ষ নির্বাচন করে বেড়াতে হবে না। নদীমাতৃক পশ্চিমবাংলার চাককেওড়ার বিস্তার ঘটান। এতে করে একদিকে যেমন কাঠের যোগান বাড়বে, অন্যদিকে তেমনই বাদুড়, বানর, হনুমান প্রভৃতি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খাদ্যের সংস্থান হবে। দরিদ্র মানুষও অতিরিক্ত পুষ্টি পাবে।

এখানে মনে রাখতে হবে চাককেওড়া কিন্তু সুন্দরী গাছ নয়। একশো সুন্দরী গাছ রোপণ করলে হয়ত পাঁচটা বাঁচে। চাককেওড়া বাঁচবে শতকরা নব্বই ভাগ। বাবুঘাটে হুগলির ধারে এই চাককেওড়া গাছগুলো সেই বার্তাই বহন করছে। সুতরাং আর কালবিলম্ব নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা, অর্থাৎ ২০২০ সালের মধ্যে রাজ্যের ৩৩ শতাংশ সবুজায়নের লক্ষ্যে প্রধান ভিত্তি হোক সোঁদরবনের চাককেওড়া। বাঘের দেশ থেকে মানুষের দেশে তোমাকে স্বাগত। “ইবার হিথায় তুকে মানাইছে বেশ রে...।”