Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

বাক্সার ২৩ মাইল টাওয়ারে সাক্ষী ছিলাম আমরা
মানুষের কথা বুঝল বুনো হাতি

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে দীর্ঘ ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা নির্ভর এই বিশেষ নিবন্ধটি লিখছেন ‘ইণ্টারন্যাশনাল ইউনিউন ফর কনজারভেশন অফ নেচার’–এর দক্ষিণ এশিয়া সি.ই.সি. সদস্য শমীক গুপ্ত।

বনে গিয়ে বন্যপ্রাণী দেখতে পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। কোন দিন ভাগ্য সুপ্রসণ্ণ থাকলে, দিনের প্রথমেই হয়ত কোন না কোনও বণ্যপ্রাণীর দেখা মিলতে পারে। অন্যথায়, টানা সাতদিন বনে ঘুরে একটাও বণ্যপ্রাণীর দেখা মেলে না। তবে বনকর্মীদের সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আর.টি’র মাধ্যমে তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। ফলে তারা বন্যপ্রাণীর গতিবিধি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে। সেবার আলিপুরদুয়ার পৌঁছে খবর পেলাম ২৩ মাইল টাওয়ারের সামনে একটা সল্ট-লিক্ আছে। বনদপ্তর নিয়মিত সেখানে নুনের জোগান দিয়ে থাকে। সেই সময় উত্তরবঙ্গের একটি যাযাবর বুনো হাতির দল নিয়মিত সেই সল্টলিক-এ এসে নুন খেয়ে আসত। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, প্রতিটি তৃণভোজী প্রাণীরই শারীরবৃত্তিয় কারণে অতিরিক্ত নুনের প্রয়োজন হয়। প্রকৃতিতেও ছোট ছোট টিলা কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে এই ধরনের খনিজ নুনের উৎস আছে। যদিও বর্তমানে, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার অরণ্যে নুনের যোগান দেওয়ার ব্যবস্থা আছে।

আমরা সেবার একটা তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজে বাক্সায় গিয়েছিলাম। সুতরাং এই ধরনের একটা দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে চাইছিলাম। কিন্তু বাধ সাধল সময়। ওরা বলল; হাতির দল নাকি সন্ধে ছটার পর আসে। কিন্তু, অত অন্ধকারে ছবির জন্য আলো পাব কোথা থেকে?এদিকে, এত লোভনীয় সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। তাই সারাদিন খোঁজখবর করে বেশ কিছু সার্চ লাইটের ব্যবস্থা করলাম। অতঃপর সন্ধের মুখোমুখি এক দীর্ঘ শ্বাসরোধী বনপথ অতিক্রম করে ২৩ মাইল টাওয়ারে পৌঁছলাম। এরপর অপেক্ষার পালা। জোরে কথা বলা চলবে না। নিজেদের মধ্যে ফিস্ ফিস্ করছি। চাপড় মেরে মশা মারাও চলবে না। ছবির জন্য তাই সই। দেখতে দেখতে কয়েক ঘন্টা কেটে গেল। মাঝেমধ্যে ময়ূর আর ঝিঁঝিঁদের গগনভেদী আওয়াজ ছাড়া কিছুই কানে আসছিল না।

হঠাৎ একটা ঝড় । না, প্রাকৃতিক ঝড় নয়। অন্য কিছু হবে। ফটাফট গাছের ডাল ভাঙার শব্দ। শব্দটা ঝড়ের মত আমাদের টাওয়ারের চারপাশে ঘুরছিল। আধো জ্যোৎস্নার হাল্কা আলোতে দেখলাম, একটা পূর্ণবয়স্ক হাতি ঝড়ের মত ছুটে আমাদের কাঠের টাওয়ারকে প্রদক্ষিণ করছে। আর যে সব বেয়ারা ডালপালা তার পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছিল, শুঁড় দিয়ে সেগুলোকে পটাপট্ ভাঙছে। এরপর সোজা ছুটে গেল সল্টলিক্-এর কাছে। সেখানে গিয়েই শুঁড় তুলে এক গগনভেদী চিৎকার। তারপর নিমেষে উধাও হয়ে গেল। চারপাশ শুনশান।ছবি তোলার জন্য সার্চ জ্বালানো দূরের কথা, ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা সবাই কেমন যেন বিহ্বল এভাবেই কাটল মিনিট তিরিশ। তারপর দূর থেকে আবছা দেখতে পেলাম প্রায় ৩৫-৪০ টি হাতির একটি বিশাল দল এগিয়ে আসছে সল্টলিক্-এর দিকে।

আগেই বলেছি, আধো পূর্ণিমার ক্ষীণ আলোতে ভয়াল সবুজ বনানীর মাথাগুলো শ্বেতাভ্র বর্ণ ধারণ করেছে। অসংখ্য পত্রসন্ধির ফাঁক-ফোকর দিয়ে আলোর ছটা গিয়ে পড়ছিল হাতিগুলোর পিঠে। অমসৃণ প্রতিফলনহীন চামড়া সেই ক্ষীণ আলো গিলে নিচ্ছিল। লেট্স সুইচ্ অন্। সব সার্চগুলো জ্বলে উঠল। পরিস্কার দেখতে পেলাম সল্টলিক্-এর চারপাশে গোল করে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে হাতির দল। বিভিন্ন স্বরে নিজেদের মধ্যে শলা পরামর্শ করছিল। বনরক্ষী বলল, “আসলে আজকে নুনটা দেওয়া হয়নি তো, তাই ওরা খুব বিরক্ত’’। মুহূর্তের মধ্যে সবগুলো একসঙ্গে চিৎকার জুড়ে দিল। অন্ধকারে রক্ত হিম্ করা পরিবেশে হাতিদের সম্মিলিত চিৎকার। সেই বিরল অভিঞ্জতা লিখে বোঝতে পারব না। ক্যামেরা চলছিল। এতক্ষণ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। হঠাৎ বিভ্রাট। বাকি হাতির দল দাঁড়িয়ে রইল সল্টলিক্-এর কাছে। কিন্তু নুন না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই হাতিটি ছুটে এল টাওয়ারের দিকে। চারটে শালখুঁটির ওপর টাওয়ারটা দাঁড়য়ে আছে। ওর একটা ধাক্কাতে গুঁড়িয়ে যেতে পারে। টাওয়ারের ওপরে আমরা কয়েকটি কীট-পতঙ্গ (হাতির কাছে)। তখন নিজেদের তেমনই মনে হচ্ছিল। যাইহোক, টাওয়ারের সামনে এসে ওর কি মনে হল জানি না। থমকে দাঁড়াল। শুঁড় তুলে একবার হুঙ্কার করল। কি উপায়? ইশারায় বনরক্ষীদের জিঞ্জেস করলাম। মৃত্যু অনিবার্য জেনেও একটা ঝুঁকি নেওয়া হল। টাওয়ারের কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। একদম হাতির মুখোমুখি। এক বৃদ্ধ বনরক্ষী আমাদের থেকেও আরও কয়েক পা এগিয়ে গেল। তখন হাতির সঙ্গে দূরত্ব বড়জোর ৮/১০ ফুট হবে। তার সামনে হাত জোড় করে প্রার্থনার সুরে বলতে লাগল,“শোন্ বাবা, আজকে ডিভিশন থেকে নুনের বস্তা আসেনি। রাস্তায় গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছিল। আমি কথা দিচ্ছি, কাল তো দের জন্য আমি ঠিক নুন নিয়ে আসব। আজকের দিনটা ছেড়ে দে বাবা’’।

বেশ বুঝতে পারছি, পাঠকরা যারা পড়ছেন হয়ত হাসছেন। এও আবার হয় নাকি! আমি বলছি, হ্যাঁ হয়। আলবাত হয়। পাঠকদের বলি, ঘটনার বাকিটুকু শুনুন। বনরক্ষীর প্রার্থনা শেষ হতেই হাতিটা ওর দিকে তাকিয়ে আবার একটা হুঙ্কার ছাড়ল। পরিস্কার বোঝা গেল, সেই হুঙ্কারের বার্তা হচ্ছে, “It’s okay for today, mind it!” নিমেষে ঘুরে দাঁড়াল। গগণভেদী চিৎকারে দলের সতীর্থদের উদ্দেশ্যে কিছু একটা বার্তা পাঠাল। অনুগত শিষ্যের মত গোটা দলটা জঙ্গলে মিলিয়ে গেল। অবিশ্বাস্য হলেও, এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী রইলাম আমরা কয়েকজন।

এবার আপনারই বলুন, এই ঘটনার পর কিভাবে অবিশ্বাস করি যে, বন্য জন্তুরা মানুষের ভাষা বোঝে না? বিশেষ করে হাতি! তবে হ্যাঁ, সেই বলার মধ্যে, বোঝানোর মধ্যে, অবশ্যই আর্তি থাকতে হবে। সত্য বলতে হবে। শঠতা বোধহয় বুঝতে পারে ওরা!