Nature Indian Logo

The Sleepless Sentinel

দক্ষিণবঙ্গ থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে :
বিলুপ্তির পথে ভারতীয় নেকড়ে

শমীক গুপ্ত, নেচার ইন্ডিয়ান, কলকাতাঃ প্রায় ২৫ বছর আগের কথা। তখন সবেমাত্র কর্মজীবন শুরু করেছি। ভারতীয় আদিবাসী সংস্কৃতির ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রকল্পে কাজ করছিলাম। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে ঘুরে কাজ হচ্ছিল। এমনই একদিন আমাদের প্রকল্প পরিচালক আমাকে এবং সহ-পরিচালককে ডেকে বললেন, কালই তোমাদের পুরুলিয়া যেতে হবে। ওখানকার সাঁওতালদের গৃহসজ্জার ওপর কিছু ছবি দরকার। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, ভারতের প্রায় সমস্ত আদিবাসী সমাজেই ‘দেওয়াল অঙ্কণ’ এর প্রচলন আছে। বিভিন্ন জায়গা, বিভিন্ন বর্ণের মাটি মিশিয়ে এরা অদ্ভুত বর্নবৈচিত্র্যের সৃষ্টি করে।আর সেই সমস্ত রঙের সুনিপুণ ব্যবহারে তারা মাটির দেওয়ালে অসাধারণ শিল্প সৃষ্টি করে। যার মধ্যে দিয়ে তাদের সমাজ জীবন, বিশ্বাস এবং সংস্কারের নানান দিক ফুটে ওঠে। একে বলা হয় ‘ইটাল’।আমাদের কাজটা ছিল এই ইটাল কেন্দ্রিক।

যাইহোক, এর আগে আমি কখনও পুরুলিয়া যাইনি। সেই প্রথম। পরদিন সকালে ট্রেনে চেপে দুজনে রওনা হলাম। সহ-পরিচালক আগে বেশ কয়েকবার পুরুলিয়া গেছেন। যেতে যেতে আমাকে পুরুলিয়া সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল করছিলেন। খুব সম্ভবত বেলা ১১/১২ নাগাদ সেখানে পৌঁছলাম। রুক্ষ-শুষ্ক জায়গা, চারদিকে ধূ ধূ প্রান্তর। সাইকেল ভ্যান পাওয়া গেল না। অগত্যা হাঁটতে শুরু করলাম। সাঁওতাল পাড়া বেশ খানিকটা দূরে। জ্যৈষ্ঠর প্রখর রোদ্দুর। তখন আজকের মত সঙ্গে জলের বোতল নিয়ে চলার রেওয়াজ ছিল না। দুজনেরই তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে আসছিল। আর পারলাম না। একটা বড় ঝিল দেখতে পেলাম। দু’জনে একবার দৃষ্টি বিনিময় করে মহাতৃপ্তির সঙ্গে সেই জলই পান করে ফেললাম। আবার হাঁটা শুরু। প্রায় বেলা তিনটে নাগাদ নির্দিষ্ট সাঁওতাল গ্রামে পৌঁছলাম। বেশ ঘন ঝোপঝাড় আর গাছ-গাছালি ঘেরা ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম।

কিন্তু গ্রামে পৌঁছেই আমরা অপ্রস্তুত এক নিদারুণ অবস্থার মধ্যে পড়লাম। গোটা গ্রামে তখন হুলস্থুল চলছে। সেখানকার কয়েকজন গ্রামবাসী সহ-পরিচালকের পূর্বপরিচিত ছিলেন। তারাও তখন আর অতিথি আপ্যায়নের মত অবস্থায় ছিলেন না। দেখেও না দেখার ভান করেছিলেন। খুবই স্বাভাবিক। বড়সড় কিছু একটা ঘটেছে, সেটা অনুমান করতে পারছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা যে কি, তা তখনও আন্দাজ করতে পারিনি। অনেক পরে জানতে পারলাম। ঘটনার বিবরণ শুনে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ! ওই গ্রামেরই এক বধূ কয়েক সপ্তাহ আগে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। তার স্বামী ঠিকাদারের কাজে দিনমজুরের কাজ করে। সদরে কাজ চলছিল। দিন-দশেক বাড়ির বাইরে। বাড়িতে সদস্য বলতে বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, বছর ৩/৪ এর এক ব্যাটা আর সদ্যজাত ওই বেটি। বৃদ্ধা চলাফেরা করতে পারেন না। মাটি- নিকোন দাওয়ার একপাশে বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন। দাওয়ার অন্যপাশে সদ্যজাতকে শুইয়ে রেখে তার মা গোবর কুড়োতে গিয়েছিলেন। পাহারাদার ছিল ওই বছর ৩/৪ এর ব্যাটা। তার আর ঠায় বসে থাকতে ভাল লাগবে কেন? ফাঁক পেয়ে সে-ও বাইরে ছুট লাগিয়েছিল। ব্যাস, মোক্ষম সুযোগ। সদ্যজাতকে মুখে তুলে পালিয়েছে কোন এক জন্তু। অসহায় বৃদ্ধা তা দেখেও কিছু করতে পারেননি। তার চোখের সামনে দিয়ে জন্তুটা শিশুটিকে মুখে করে তুলে নিয়ে গেছে। বৃদ্ধার ক্ষীণ কন্ঠস্বর কারও কানে পৌঁছয়নি। ফলে সেটা যে কি জন্তু, তা ওই ক্ষীণ-দৃষ্টির বৃদ্ধা ছাড়া আর কেউই প্রত্যক্ষ করেননি। স্মৃতিদুর্বল বৃদ্ধার মুখে জন্তুটির বর্ণনা শুনে যা মনে হয়েছিল, তাতে করে জন্তুটি নেকড়ে বলেই সকলে অনুমান করেছিলেন। সেদিন সদ্য সন্তান-হারা মায়ের হা-হুতাশ দেখে সত্যিই খারাপ লেগেছিল। তাই ওই ঘটনা আজও আমি ভুলতে পারিনি। হয়ত কোনদিন পারব না।

এই হল নেকড়ে। প্রচলিত ডাকে নেকড়ে বাঘ। রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর গল্প যারা পড়েছেন, তারা নিশ্চয় জানেন, নেকড়েদের নিয়ে নানান রোমহর্ষক গল্প-গাথা লেখা হয়েছে। বিশেষ করে শিশু সাহিত্যে নেকড়ে বাঘের ব্যাপক পরিচিতি। যদিও নেকড়ে, হায়না, শিয়াল, খেঁকশিয়াল, এমনকি কুকুরও কিন্তু সুযোগ পেলে এমনটা করে থাকে। এরা খুবই ধূর্ত, বুদ্ধিমান এবং সুযোগসন্ধানী। কিন্তু সাহিত্য গুণে খলনায়ক হল কেবলমাত্র নেকড়ে। যার সাহেবি নাম ‘উল্ফ’, বৈঞ্জানিক নাম ‘ক্যানিস লুপাস’ (ভারতীয় নেকড়ে)। বর্গ কারনিভো্রা বা মাংসাশী, বংশ ক্যানিদ, গণ ক্যানিনি। বৈঞ্জানিক অনুসন্ধান পর্বের শুরুতে, ভারতীয় নেকড়েদের (ক্যানিস লুপাস) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধূসর নেকড়ে প্রজাতির (ক্যানিস লুপাস প্যালিপেস) এস বিচ্ছিন্ন অংশ বলে গন্য করা হত। ভারতে এই নেকড়েদের তিনটি ভিন্ন বংশ-সূত্র পাওয়া যায়। দুটি এই উপমহাদেশে সুপ্রাচীন। অনুমান করা হয়, ভারতে প্রথম নেকড়েদের আর্বিভাব ঘতেছিল আজ থেকে প্রায় চার কোটি বছর আগে। বিঞ্জানীদের অনুমান, এটা খুব সম্ভবত ছিল অস্ট্রেলেশিয়া উদ্ভুত কুকুর বিশেষ ‘ডিঙ্গো’দের উত্তরসূরি আদি ভারতীয় নেকড়ে। এখানে বিস্তার পাওয়ার পরপরই এরা এদের পূর্বসূরিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। হয়ত ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতার কারনে। ফলে এদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র জিনগত চরিত্র প্রকাশ পায়। যতদূর জানা যায়, এরা কখনও এখানকার অন্য কোন সম-বংশীয় প্রাণীদের সঙ্গে মেলামেশা করেনি। অর্থাৎ চারিত্রিক উন্নাসিকতা ছিল। ফলত, এদের সূত্রে ভারতে কোন সংকর নেকড়ে সৃষ্টি হয়নি। ভারতে নেকড়েদের দ্বিতীয় বংশ-সূত্রটি হল ওই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধূসর নেকড়ে প্রজাতির ‘ক্যানিস লুপাস প্যালিপেস’ বিচ্ছিন্ন অংশ। যা আগেই আলোচনা করেছি। এর অনেক পরে তৃতীয় একটি লাইন আসে। হিমালয়ান নেকড়ে (ক্যানিস ল্যানিজার)। আদপে এটা তিব্বতী নেকড়েদের (ক্যানিস লুপাস চ্যাঙ্কো) এক উপ-জাতি মাত্র। ১৮৪৭ সালে ইংরেজ প্রকৃতিবিদ্ হজসন প্রথম ভারতীয় নেকড়েদের বর্ণনা দেন। যদিও তাঁর বর্ণিত প্রাণী ছিল ওই তিব্বতী নেকড়ে। যা আধুনিক ভারতীয় নেকড়ে থেকে আলাদা। পরবর্তী ইংরেজ প্রকৃতিবিদ ব্লানফোর্ড ১৮৮৮ সালে ভারতীয় নেকড়েদের যথার্থ বর্ণনা দেন। সেইসঙ্গে তিনি দুটি প্রজাতির মধ্যে তুলনামূলক বিচার করে দেখান যে, ভারতীয় নেকড়ে আকার এবং উচ্চতায় হিমালয়ান নেকড়ের চেয়ে ছোট। এদের মাথার খুলি এবং দাঁতও অপেক্ষকৃত ছোট। গায়ে লোমের ঘনত্ব কম। অতঃপর ১৯৪১ সালে ইংরেজ শ্রেণীবিভাজক পোকক ভারতীয় এবং হিমালয়ান দুটি নেকড়েকে আলাদা করে ফেললেন। তিনি দেখালেন যে আদপে এরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধূসর নেকড়ে প্রজাতির দুটি উপ-প্রজাতি মাত্র, আর শ্রেণীবিভাগে, ১৮৪৭ সালে হজসন বর্ণিত নেকড়ের অবস্থান গিয়ে পড়ল ইউরেশিয়ান গোষ্ঠীতে (ক্যানিস লুপাস লুপাস)। আরও পরে আধুনিক ডি.এন.এ বিশ্লেষণের পর ভারতীয় নেকড়ে উপ-প্রজাতিকে (ক্যানিস লুপাস) পৃথক প্রজাতি (ক্যানিস ইন্ডিকা) বলে ঘোষণা করার কথাও শোনা যাচ্ছে। আগেই বলেছি, ভারতীয় নেকড়ে উপ-প্রজাতিকে (ক্যানিস লুপাস) পৃথক প্রজাতি (ক্যানিস ইন্ডিকা) বলে ঘোষণা করার কথাও শোনা যাচ্ছে। আগেই বলেছি, ভারতীয় নেকড়ে (দ্বিতীয়) উপ-প্রজাতি (ক্যানিস লুপাস) সম্পূর্ণ আলাদা(ইউরেশিয়ান অরিজিন)। এদের ভারতে আগমন ঘটে আদি নেকড়ের (প্রথম) (অষ্ট্রেলেশিয়ান অরিজিন) অনেক পরে। বড়জোর ৮/১০ লক্ষ বছর আগে। এরা আবার আফগানিস্থান এবং পাকিস্থান হয়ে ভারতে আসে।

যাইহোক, আধুনিক ভারতীয় নেকড়ে উপ-প্রজাতি (ক্যানিস লুপাস)ধরেই আলোচনা এগোন যাক। এরা মূলত মরুপ্রায় এবং শুষ্ক অঞ্চলের প্রাণী। এই উপমহাদেশের পূর্ব এবং ভারতের পশ্চিম-মধ্যভাগ জুড়ে এদের বিস্তৃতি। অর্থাৎ গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশ। এখন পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে পশ্চিমবঙ্গে নেকড়ে এল কিভাবে? যা এই লেখার শুরুতেই আলোচনা করেছি। এখানে মনে রাখতে হবে, ভৌগলিক বিন্যাস অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের বাঁকড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, বর্ধমান জেলার বেশিরভাগ অংশ এমনকি হুগলি এবং মালদা জেলারও খানিকটা অংশ ভারতীয় শুষ্ক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই এইসব অঞ্চলে, মূলত দক্ষিণবঙ্গে নেকড়েদের বিস্তার ঘটেছে। বিস্তৃত পতিত প্রান্তর, গো-চারণ ক্ষেত্র, ছোট ঝোপ কিংবা গুল্ম জাতীয় বনভূমি এদের আদর্শ বাসভূমি। ঠাণ্ডায় এরা বড় একটা থাকতে পারে না। তাই হয়ত নিজেদের আবাসস্থল হিসাবে প্রখর গ্রীষ্মমন্ডলীকে বেছে নিয়েছে। তবে প্রাকৃতিক পানীয় জলের উৎস থাকা চাই। এদের লোমের ঘনত্ব বেশ গাঢ়। এককথায় বড় মাথার এ্যালসেশিয়ান কুকুর বললে বুঝতে সুবিধে হয়। দৈর্ঘ্যে এরা ৩-৪ ফুটের মধ্যে। কাঁধের উচ্চতা ২-৩ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। দেহের ওজন ১৮-২৭ কিলোগ্রাম পর্যন্ত নথিভুক্ত হয়েছে। যা কিনা ধূসর নেকড়ের চেয়ে বেশ কম। এদের চোখ দুটো বেশ বড় এবং অনেকটা তে-কোনা গোছের। পা দীর্ঘ এবং বলিষ্ঠ।

এদের পরে ভারতীয় মানচিত্রে স্থান করে নিল হিমালয়ান নেকড়ে। যা আদপে তিব্বতী নেকড়দের একটি উপ-প্রজাতি মাত্র। এরা মূলত ঠান্ডা দেশের প্রাণী। এদের মূল বিচরণক্ষেত্র হল পূর্ব-চীন এবং মঙ্গোলিয়া। কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই হিমালয়ান নেকড়েদের একটা বিচ্ছিন্ন অংশ ভারতে বিস্তার পেয়েছে। যদিও তা খুবি স্বল্প পরিসরে। জম্মু-কাশ্মীর এবং হিমাচলের কয়েকটি প্রত্যন্ত অংশে এদের অস্তিত্ব আছে। তবে নেপাল হিমালয়ে বেশ ভাল সংখ্যায় আছে। ভারতের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় বেশ কিছু হিমালয়ান নেকড়ে আছে।

যাইহোক, নেকড়েদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কিন্তু ভারি অদ্ভুত। সম-বংশীয়দের (শিয়াল, ঢোল, খেঁকশিয়াল) থেকে এরা একেবারে স্বতন্ত্র্য। সাধারণত ছোট ছোট দলে বসবাস করে। বড়জোর ৪/৫ টি। রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর গল্পের সঙ্গে বড় একটা মিল পাওয়া যায় না। জানি না, অতীতে অত বড় একটা মিল পাওয়া যায় না। জানি না অতীতে অত বড় দল ছিল কিনা। আর থাকতেও পারে। সব কিছুই তো পরিবর্তনশীল। আমরাও তো আগে বড় বড় যৌথ পরিবারে থাকতাম। এখন থাকি নিউক্লিয় পরিবারে। আসলে যে কোন প্রাণীরই অভ্যাস নির্ভর করে তার পারিপাপার্শ্বিকতা, মানসিকতা এবং অন্ন সংস্থানের ওপর। এর কোনটাতে খামতি হলেই সে তার পুরনো অভ্যাস পরিত্যাগ করবে। হয়তো নেকড়েদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। বেশ কয়েকবার এদের খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। তাতে করে এদের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি আমাকে বিস্মিত করেছে তা হল অভিব্যক্তি। স্বরের তারতম্য, কান এবং মুখমন্ডলের প্রতিটি পেশিকে এরা ভীষণভাবে নিজেদের মধ্যে বার্তা আদান প্রদানের কাজে লাগায়। এক একটি নেকড়ের দল সাধারণত ১০০-২০০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল নিয়ে বসবাস করে। তবে জায়গা, শিকার এবং পানীয় জল প্রাপ্তির ভিত্তিতে এই পরিমাপের তারতম্য হতেই পারে। বাচ্ছাদের নিরাপত্তা এবং তাদের যথার্থ প্রতিপালন, এদের কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সামান্যতম সন্দেহ হলেই এরা বাচ্ছাদের অন্যত্র সরিয়ে ফেলে। খুব সম্ভবত এরা আগাম একাধিক বাসা নির্ধারণ করে রাখে। অসম্ভব চতুর এবং বুদ্ধিমান। জলা জায়গার আশেপাশে নরম মাটিতে গর্ত করে এরা বাসা বানায়। তবে খুব নিচুতে নয়। জলস্তর থেকে কমপক্ষে ৮/১০ ফুট ওপরে। অর্থাৎ বর্ষার জল ঢোকার ব্যাপারে সচেতন। আগেই বলেছি, অসম্ভব বুদ্ধিমান প্রাণী। এ্যলসেশিয়ান কুকুরদের বুদ্ধি সর্বজনবিদিত। নেকড়ের বুদ্ধি তার কয়েকশো গুণ। শুনেছি এ্যালসেশিয়ান তৈরিতেও নেকড়ের অবদান আছে। তা হতে পারে, চেহারা এবং বুদ্ধির মিল আছে। যা আলোচনা করছিলাম, এদের বাসায় সাধারণত দুটি প্রবেশ পথ থাকে। একটি বাসার মেঝে থেকে ২/৩ ফুট উঁচুতে। অন্যটি বাসার মাথার ওপর। কোন শত্রু-আক্রমণ হলে যাতে অন্য পথ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। বাসাটি লম্বায় ৭/১০ ফুট কিংবা তারও বেশি হতে পারে। বাসার বাইরে এবং ভিতর ঘন ঝোপঝাড়ে ঢাকা থাকে। খুঁজে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। এ শিয়ালের গর্ত নয়, যে গেলেই দেখা যাবে। তবে পাহাড়ি এবং টিলা অঞ্চলে এরা সাধারণত বড় বোল্ডারের গভীর খাঁজে কিংবা নিরিবিলি গুহার মধ্যে বাসা বাঁধে। তবে সেই অঞ্চল অবশ্যই ঘন ঝোপঝাড়পূর্ণ হওয়া চাই। নেকড়ে বাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তার দিক-নির্নয়। দেশ-বিদেশে এই নিয়ে অসংখ্য পর্যবেক্ষণ হয়েছে। তাতে করে যা জানা যায় তা হল, কমপক্ষে ৮০ শতাংশ নেকড়ের বাসাই হয় উত্তর-দক্ষিণমুখো! এবং নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এর একমাত্র কারণ হল বাতাস চলাচলের সাপেক্ষে গন্ধের মাধ্যমে আগাম শত্রুর আগমন টের পাওয়া যাবে। এটা কুকুর-বংশীয় (canid) প্রায় সব প্রাণীদেরই আছে। অনেক পোষা কুকুরও কয়েক পাক ঘুরে উত্তর-দক্ষিণমুখো হয়ে বসতে দেখা যায়। কারণ একই।

এরা প্রধানত দিনের দুটি সময়ে শিকারে বেরোয় দলবদ্ধভাবে। এক, কাকভোরে দুই, গোধুলি বেলায় অর্থাৎ সন্ধের মুখে। এর কারণ সহজবোধ্য। প্রথমত জানতে হবে, কারা এদের শিকার? এদের প্রধান শিকার হল গবাদি পশু। জঙ্গল পার্শ্ববর্তী গ্রামে খুব ভোরে গবাদি পশুর খামার থেকে ছেড়ে দেওয়ার রেওয়াজ আছে, কচি শিশির-সিক্ত ঘাস পাওয়ার জন্য। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যার জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ে। বন্য তৃণভোজীরাও সেই লোভে জঙ্গলের ধারে চলে এসে প্রতিযোগিতা বাড়ায়। সুতরাং ভাল খেতে হলে আগে যাও। এই বিধান অনুযায়ী খামার মালিক সাত সকালেই দরজা খুলে দেন। কিন্তু এত সকালে ঘুম জড়ানো চোখে তাঁর যেতে ইচ্ছা করবে না। এটাই স্বাভাবিক। তিনি আরও একটু গড়িয়ে নিয়ে, চা-পান করে হেলতে দুলতে মাঠে যান। খেদাদারের অনুপস্থিতিতে গবাদি পশুরাও নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো ছন্নছাড়া হয়ে চলতে থাকে। কেউ কেউ আপন খেয়ালে দলছুট হয়ে অনেক দূরে চলে যায়। শিকারির কাছে এটা সুবর্ণ সুযোগ। নেকড়েরাও এই সুযোগের পূর্ন সদ্ব্যব্যবহার করে। কাক-পক্ষী হয়ত টের পায়। কিন্তু অন্য কেউ নয়। মানুষ তো দূরের কথা, এমনকি দলের অন্যান্য গবাদি পশুরাও সচরাচর শিকারি প্রাণীর অস্তিত্ব টের পায় না। ফলে, দিনের অন্য সময়ে তাকে দেখলেও কুকুর ভেবে গুরুত্ব দেয় না। নেকড়াও তখন তাদের ভয়ানক রূপটি প্রকাশ করে না। বেমালুম সহাবস্থান চলতে থাকে। যাতে করে তাদের মধ্যে না ত্রাসের সৃষ্টি হয়। এতটাই ধূর্ত এই নেকড়ে প্রজাতি! একই অঙ্কে গোধুলি বেলা শিকার ধরার পক্ষে আদর্শ সময়। এমনিতেই দুপুরের পর থেকে বন-পার্শ্বর্থ অঞ্চলে অন্ধকার নেমে আসতে থাকে। যত সময় এগোতে থাকে অন্ধকারের গাঢ়ত্ব বাড়ে। এই সময় ঘরমুখো পশুরা আলস্যভরে চলতে থাকে। চোখেও ভাল দেখে না। খেদাদারের অসর্তকতায় তাদের মধ্যে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঝোপের আড়াল থেকে সবকিছু লক্ষ্য করতে থাকে নেকড়ে। সুযোগ বুঝলেই অতর্কিত আক্রমণে শিকারের টুঁটি টিপে ধরে। আর্তনাদ করাও সুযোগ পায় না হতভাগ্য শিকার। এখানে মনে রাখতে হবে, বিড়াল বংশীয় প্রাণীরা(বাঘ, লেপার্ড প্রভৃতি) সচরাচর পেছন থেকে শিকারের ঘাড় কামরে ধরে (একক শিকারি প্রত্যাঘাতের ভয় পায়)। ফলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একবারের জন্য হলেও শিকারের আর্তনাদ শোনা যায়। কিন্তু কুকুর বংশীয় শিকারিরা সেই সুযোগ দেয় না। গলার টুঁটি কামড়ে ধরে। আর সঙ্গে সঙ্গে দলের অন্যরা এসে শিকারের চার-পা চেপে ধরে। ফলে প্রত্যাঘাতের ভয় থাকে না। এই কারণেই নেকড়েরা দিনের অন্য সময়ে শিকার ধরে না। ব্যতিক্রম অবশ্যই হয়। এছাড়াও রাতের অন্ধকারে গেরস্থের খামার থেকে হাঁস, মুরগি, ছাগল তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও আকছাড় শোনা যায়।

নেকড়েদের সম্বন্ধে একটা অপবাদ বেশ প্রচলিত আছে। বিষয়টি বেশ বিভ্রান্তকর। শোনা যায়, নেকড়ে নাকি অন্য নেকড়েকে মেরে খেয়ে নেয়! আমার সন্দেহ, কি করে তা সম্ভব? অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু নেকড়েদের ক্ষেত্রে তা কিন্তু মোটেই প্রযোজ্য নয়। এরা এতটাই মননশীল এবং স্নেহ-পরায়ণ প্রাণী। দলের একটি স্ত্রী নেকড়ে যখন বাচ্চা প্রসব করে, তখন নিজেদের দলের সকলে তো বটেই, এমনকি অন্যান্য দলের সদস্যরাও সম্মিলিতভাবে সেই অঞ্চল ঘিরে পাহারা দিতে থাকে। বাচ্চা প্রতিপালন এবং তার নিরাপত্তায় তারা সমানভাবে সাহায্য করে। এমনকি দলের কোন সদস্যের মৃত্যু হলে, সকলে মিলিত হয়ে শোকঞ্জাপন করছে-এমন ঘটনাও অনেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। সুতরাং সেই প্রাণী নিজের স্বজাতিকে মেরে খাবে, এমন তথ্য মেনে নেওয়া কঠিন!

এদের চরিত্রের আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, এরা যতটা সন্দেহ করে, তার চেয়েও বেশি হল মানুষের প্রতি এদের অদম্য কৌতুহল। কি যে জানতে চায় বুঝি না। একবার বাঁকুড়ার এক বনবাংলোয় রাতের অন্ধকারে ঘন্টার পর ঘন্টা একটি নেকড়ে অনুসনন্ধিসু দৃষ্টি নিয়ে বাংলোর ঘরের দিকে লক্ষ্য করতে দেখেছি। চৌকিদারকে জিঞ্জেস করেছিলাম, “হ্যাঁ গো ও কি উচ্ছিষ্ট খাবারের জন্য এমন করে চেয়েছিল?” সে বলেছিল, “না, স্যার। খাবার তো আমরা রোজই দিই। কখনও নেকড়ে খায়। কখনও শিয়াল। কাল রাতেও দিয়েছিলাম। খায়নি। বোধহয় পেট-টান(ভর্তি) ছিল?” তাহলে? কি জানি স্যার। অতিথি তো এখানে কম আসেন। এলেই ওরা অমনি করতে থাকে! নেকড়েদের এহেন আচরণের নেপথ্যে কি যে মনস্তত্ত্ব কাজ করে তা আজও বিঞ্জান অনুধাবন করতে পারেনি।আমি তো নই-ই!

আবার খাবারের কথায় আসছি। নেকড়েদের গবাদি পশু (ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগি)শিকারের কথা আগেই আলোচনা করেছি। ওটা একটা দিক। অন্য আরেকটা দিক হল, জঙ্গলের শিকার। সাধারণত নিজেদের আকারের চেয়ে ছোট যেকোন শিকারই এরা ধরে। যেমন, হরিণের বাচ্চা, ছোট বিড়াল বংশীয় প্রাণী (বনবিড়াল, মেছোবিড়াল, ছিটবিড়াল ইত্যাদি), বুনো খরগোশ, বেজি, গোসাপ, বনমুরগি, মেঠো ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, হরেক প্রাণী। এছাড়াও নেকড়ের বৃষ্ঠা ঘেঁটে মাছের আঁশ্, সজারুর কাঁটা এবং নানান প্রজাতির ঘাসও পাওয়া গেছে। এই ঘাস খাওয়ার ব্যাপারটা হজমের সুবিধের জন্য। বাড়ির পোষা কুকুর-বিড়াল ও অনেক সময় ঘাস খায়। বলা যেতে পারে, ঘাস হল মাংসাশী প্রাণীদের পথ্য। খাদ্য নয়। গুজরাটে নেকড়েদের নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ওখানকার নেকড়েদের প্রধান শিকার হল কৃষ্ণসার হরিণ। প্রায় ৭০ শতাংশ। ১০-২০ শতাংশ অন্যান্য প্রাণী। এক একটি শিকার-পিছু প্রতি নেকড়ে ৪/৫ কিলোগ্রাম মাংস খায়। তবে শিকার ধরে ৩/৪ দিনে একটি। তার মধ্যে আর কিছুই খায় না। সুতরাং গড়ে এক একটি নেকড়ের দিনে ১/২ কেজি মাংসের প্রয়োজন। সেই হিসেবে, একটি প্রাণীর বছরে আনুমানিক ৫০০ কেজি মাংসের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ প্রায় ৩৫-৪০ টি হরিণ কিংবা ৫০-৯০ টি ছাগল বা ভেড়া। অন্যদিকে, এই হরিণ আবার দ্রুত বংশবিস্তারকারী তৃণভোজী। সুতরাং, কোন জঙ্গলে যদি পর্যাপ্ত সংখ্যায় নেকড়েদের শিকারি প্রাণী না থাকে, তাহলে তৃণভোজীদের চাপে জঙ্গলের স্বাভাবিক বিস্তার ব্যাহত হবে। জঙ্গল ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে আসবে। যার মারাত্মক প্রভাব গিয়ে পড়বে সামগ্রিক পরিবেশের ওপর। সেদিক থেকে দেখলে নেকড়দের মতো দুর্ধর্ষ শিকারি প্রাণীদের জঙ্গলে টিকিয়ে রাখা খুবই প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে নেকড়ের কাজ শিয়াল পারবে না, বাঘের কাজ নেকড়ে পারবে না (গৌর, বুনো মোষ)। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। প্র্ত্যেকের জন্য নিক্তি মাপা আছে। খেয়াল রাখতে হবে, কোন একটি প্রজাতিকে বাঁচাতে গিয়ে, অন্যটি যেন শেষ না হয়ে যায়। তাহলে সমূহ বিপদ।

সাধারণত বর্ষার পর-পরই এই নেকড়ে মিলনে লিপ্ত হয়। অর্থাৎ ভারতে প্রায় সেপ্টেম্বরের শেষদিক কিংবা অক্টোবরের গোড়ার দিক হল নেকড়েদের প্রজনন ঋতু। গর্ভকাল ২ মাসের কিছু বেশি। দিনের হিসেবে ৬২-৬৮ দিন। এই সময় এদের মধ্যে বাসা নির্ধারণের উৎকণ্ঠা দেখা যায়। এই বিষয়ে এরা ভীষণ খুঁতখুঁতে। যা আগেই আলোচনা করেছি। বাচ্চা এবং মায়ের নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা, নিকটবর্তী অঞ্চলে শিকার প্রাণীর প্রাচুর্য, বৈচিত্র এবং সর্বোপরি পানীয় জলের জোগান-বাসা নির্ধারণের আগে নেকড়েরা এই সমস্ত দিকগুলো ভালভাবে দেখে তবেই বাসা বানায়। মহারাষ্ট্রের মালভূমি অঞ্চলে একটি নেকড়ের দলকে ৪ বছরে ১৪ বার বাসা বদল করতে দেখা গেছে। ডিসেম্বরের শেষ অথবা জানুয়ারির গোড়ায় এরা বাচ্চা প্রসব করে। এক একবারে ২-৬ টি বাচ্চা প্রসব করে। প্রসবের প্রায় ৫-৬ সপ্তাহ মা নেকড়ে বাসা ছেড়ে প্রায় বেরোয় না। কেবলমাত্র মল-মূত্র ত্যাগ এবং পানীয় জলের প্রয়োজন ছাড়া। দলের বাকি সদস্যরা তখন তাকে নান স্বাদের খাবার জুগিয়ে যায়। এমনকি অতিরিক্ত খাবার মাটি বা বালির নিচে ঢুকিয়ে রেখে সঞ্চয় করতেও কেউ কেউ দেখেছেন।আজ থেকে বছর পনেরো আগে একবার পুরুলিয়ার আদিবাসীদের সাহায্যে একটি নেকড়ের বাসায় পৌঁছে গেছিলাম। খুব সম্ভবত সেটা মার্চ মাস ছিল। আদিবাসীদের হুটোপাটিতে মা নেকড়ে ভয় পেয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল। বাসায় তখন তিনটি বাচ্চা ছিল। বাচ্চাদের বয়স তখন ৪০/৪৫ দিন হবে। বেশ চটপটে হয়ে উঠেছিল। দুটি বাচ্চা ভ্যাবাচাকা খেয়ে কেঁউ-কেঁউ করতে ছুট লাগাল। তৃতীয়টিকে আমরা পাকড়াও করলাম। কিন্তু সেটা জন্মান্ধ ছিল। পরে ওই আদিবাসীদের কাছ থেকে নিয়মিত ওদের খবর নিতাম। জেনেছিলাম ওরা অন্য কোথাও বাসা সরিয়ে নিয়ে গেছে। তবে প্রায় ৮/৯ মাস পর্যন্ত ওই বাচ্চা দুটোকে ওই দলেই ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। অন্ধ বাচ্চাটি সম্ভবত মারা গেছিল বা অন্য কোন প্রাণীর শিকার হয়েছিল। প্রাণী জগতে এটাই নিয়তি। কেউ যদি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়, তাকে অকালে মরতেই হবে। তা সে পিঁপড়ে, হাতি বা বা বাঘ, যাইহোক না কেন।

এবার বর্তমানে ভারতের নেকড়ে সংখ্যার গড়পড়তা অনুমান দেখা যাক। ২০০৪-এ একটা গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে দেখা গেল গোটা দেশে ২০০০-৩০০০ নেকড়ের অস্তিত্ব অনুমান করা হয়্যেছ। যদিও তার আগে ১৯৮১-তে অন্য একটি লেখায় ভারতে ওদের সংখ্যা ৫০০-৮০০ বলে অনুমান করা হয়েছিল। অতি সম্প্রতি ১৫০০-এর আশেপাশে বলে জানা যাচ্ছে। যার মধ্যে কেবলমাত্র গুজরাটেই ২৫০(বিশেষত কচ্ছ অঞ্চলে)। এর আগে আছে রাজস্থান। সেখানে নাকি নেকড়ে সংখ্যা ২৫০-৩৫০! বাকি সব রাজ্য মিলিয়ে ১০০০-এর মতো! অতএব বলা যেতে পারে, নেকড়ে ভারতে প্রায় বিলুপ্তির পথে। আর বড়জোর ১/২ দশকের অপেক্ষা!

কেন ভারতে নেকড়ে শেষ হয়ে এল? এর পিছনে অনেকগুলো আর্থসামাজিক কারণ আছে। প্রথমত, নেকড়েদের সঙ্গে মানুষের একটা শত্রুতার সম্পর্ক রয়েছে। নেকড়ে সুযোগ পেলে মানুষের বাচ্চা তুলে নিয়ে যায়। এখনও ফি-বছর ভারতের জঙ্গল-পার্শ্বস্থ গ্রামে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সদ্যজাত শিশু নেকড়ের শিকার হয়। গত শতাব্দিতে এটা ইউরোপে হত। ১৯৯৬-৯৭ মরশুমে উত্তরপ্রদেশে ৭৪ জন মানুষ নেকড়ের শিকার হয়। অধিকাংশ মারা যায়। বাকিরা মারাত্মকভাবে জখম। হতভাগ্যদের বেশিরভাগই ছিল ১০ বছরের নিচে। নথি ঘেঁটে আরও দেখা যাচ্ছে, ১৮৭৮ সালে ভারতে মানুষখেকো নেকড়ের আক্রমণে ৬২৪ জন মারা যান। অতএব মানুষও সুযোগ পেলে ছেড়ে কথা বলবে না। এ তো বলাই বাহুল্য। যদিও সেই পরিস্থিতি আজ আর নেই। দ্বিতীয়ত, নেকড়েদের আদর্শ বাসভূমি হল মরুপ্রায় অথবা শুষ্ক অঞ্চল। খুব গভীর জঙ্গলে নেকড়ে থাকে না। এখন সমস্যা হল, অত্যধিক জনসংখ্যার চাপে এধরনের আধা-বনভূমি কিংবা পতিত জমি আর নেই বললেই চলে। সবই মানুষ মেরে ফেলেছে। তাহলে ওরা থাকবে কোথায়? খাবে কি? সঙ্গত কারণেই তারা খাবারের খোঁজে (ভেড়া, ছাগল, হাঁস, মুরগি) জঙ্গল পার্শ্বস্থ গেরস্থ বাড়িতে হানা দিচ্ছে। এটা ওটা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ শিকার ধরার পন্থায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংঘাত আরও বাড়ছে। নেকড়ে অধ্যুষিত অঞ্চলে মানুষ তার ডেরায় অভিযান চালাচ্ছে। আগুন জ্বালিয়ে, ধোঁয়া দিয়ে তারা নেকড়ে উৎখাত করছে। তবে আরও সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার হল বিষ প্র্য়োগ। বিষ মেশানো পশু অথবা তার মাংস ভেট দেওয়া হয়। এতেই অধিকাংশ নেকড়ে মারা পড়ছে। কারণ, নেকড়ে দলবদ্ধ প্রাণী। একসঙ্গে সকলেই সেই বিশ-মাংস খাচ্ছে। ফলে এক এক ঝাঁকে ৪/৬ টি করে নেকড়ে মারা পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে আর কতদিন? এখানে আরও একটা বড় সমস্যা আছে। নেকড়ে কিন্তু বাঘ বা সিংহ নয়। ভারতের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নেকড়ে প্রায় নেই বললেই চলে। যা আছে সবই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে, মানুষ ঘেঁষা অঞ্চলে। ফলে সরকারের পক্ষেও নেকড়ে নিধন আটকানো প্রায় অসম্ভব কাজ। এসব ছাড়াও সমস্যা আছে। যেখানে মানুষ আছে, সেখানে গৃহপালিত কিংবা রাস্তার কুকুরও আছে। এদের আবার ভীষণ রোগ হয়। বিশেষ করে জলাতঙ্ক,পারবো এবং ডিসটেম্পার। যা হলে কুকুর বাঁচে না। রোগগুলো ছোঁয়াচেও বটে। নেকড়েরা প্রতিনিয়ত গ্রামে ঢোকার ফলে তাদের মধ্যেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। যে অঞ্চলে ছড়াচ্ছে, এক ধাক্কায় উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এতসব গভীর সমস্যার পরও উন্নয়ন, বাসভূমি ধ্বংস, কৃষির প্রসার, শিল্পায়ণ প্রভৃতির ধাক্কা তো আছেই।

ভারত সরকারের বনমন্ত্রক, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ১৯৭২ অনুযায়ী নেকড়েকে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির শীর্ষ তালিকাভূক্ত করেছে। কিন্তু যতই সংরক্ষণের আওতায় আনা হোক না কেন, নেকড়ে থাকবে না। আবেগ বাড়িয়ে লাভ নেই। ভারতের চিড়িয়াখানায় নেকড়েদের পরবর্তী প্রজন্মরা আশ্রয় নেবে। ওটাই হবে ওদের স্থায়ী ঠিকানা। ইংরেজিতে একেই বলে ‘গ্রাউন্ড রিয়েলিটি’, বাংলায় বলা যেতে পারে অধিবাস্তব!